Monday, 12 March 2018

আমার জবানবন্দী

ছুরি বসাবার ঠিক আগের মুহূর্তে লোকটার সাথে আমার চোখাচোখি হলো। তারপরেই চকচকে ইস্পাতের ফলাটা আমূল বসে গেলো ওর নগ্ন গায়ে। আমি ওই চোখে ভয় দেখতে চেয়েছিলাম। আতংকে ভরা ওর মুখ দেখার জন্য আমি অনেক রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। কিন্ত আজ, ওকে হত্যা করার তুঙ্গ ক্ষণে এসে কেমন যেন দ্বিধায় পড়ে গেছিলাম। আমি তো খুনী নই। পারবো কি সফল হতে? ওই মুখের মধ্যে ছিঁটেফোটা মনুষ্যত্ব দেখতে পেলেও হয়তো এই কাজটা করতে পারতাম না। সৌভাগ্য আমার - তেমন কিছু হয়নি। যে লোকটা হাজার হাজার লোকের সামনে হাত ঘুরিয়ে কথার জ্বলন্ত তুবড়ি ছোটায় সে কতটা কাপুরুষ তা ওই ছুরিটা মারার ঠিক আগের মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলাম। ওর সাথে চোখাচোখি হওয়ার সাথে সাথে। ভয় নয়,আতঙ্ক নয় - এক ধরনের বিকৃত ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিলাম ওই চোখে। জীবনের শেষ মুহূর্তেও ঘৃণা ওকে ছেড়ে যায়নি। আমারও তাই কোন দ্বিধা ছিলোনা। ওর কামরায় যাবার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি আমার জানা ছিলো। একটা কাগজ। ব্যাস,আর কিচ্ছু না। ওই কাগজে লেখা কয়েকটা আগড়ম বাগড়ম নাম আমাকে ওর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলো। দারুন একটা টোপ। লোকটা নিজেকে গোটা সমাজের ভাগ্যনিয়ন্তা ভাবে। যেন সব্বাই ওর পেছনে ভেড়ার পালের মতো অনুসরণ করবে। নিজের মৃত্যু দিয়ে আজকে ও জেনে গেলো যে কিছু কিছু মানুষ নিজের মতো করেও ভাবতে পারে এবং শুধু পারে নয়, সে ভাবনার এতটাই জোর যে কারুর জীবন নিতেও পিছপা হয়না।

আঘাত করার সাথে সাথে বুঝতে পেরেছিলাম যে চোট মারাত্মক হয়েছে। ফিনকী দিয়ে ওর বুক থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছিলো। সেই রক্তে আমার গাউন ভিজে গেলো কিছুটা। তার মধ্যেই কাটা ছাগলের মতো ছটপট করতে করতে " বাবা গো, মরে গেলাম গো " বলে সে এমন চেল্লামেল্লি জুড়লো যে হাসি পেয়ে গেল আমার। এই নাকি দেশ কাঁপানো মুক্তিবীর!! এর ভাষ্যেই নাকি আগুন ঝরে ঝরে পড়ে!! মৃত্যুকে নিজের মধ্যে প্রবৃষ্ট হতে দেখেও মাথা উঁচু করে থাকে যে তাকেই তো বীর বলে জানি। নাকি বীরত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে আজকাল?

পালানোর সময় ছিলো। কিন্ত এই হাস্যকর দৃশ্য দেখতে দেখতে পেছনের দরজা দিয়ে অদৃশ্য হওয়ার কথা খেয়ালই ছিলোনা। লোকজনের হইহল্লায়  চটকা ভেঙে দেখলাম খুব দেরী হয় গেছে। ওর সচিব, রাঁধুনী, কাজের মেয়ে আরো কারা সব হল্লা করতে করতে ঘরে ঢুকে পড়েছে। ততক্ষনে সাংবাদিক বাবাজীর প্রাণপাখী ফুড়ুৎ। বাড়ি ঘিরে ফেলেছে উন্মত্ত জনতা।

আমি ধরা পড়ে গেলাম।

                 **************

একটা ছোট্ট গাঁয়ে আমার ছেলেবেলা কেটেছে। সেই গাঁয়ে নদী আছে,উঁচুনীচু প্রান্তর আছে, প্রাচীন চার্চ রয়েছে, রয়েছে দুর্গের ধ্বংশাবশেষ। আমার পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছল। গাঁয়ের সবাই বাবাকে খুব ভালোবাসে। বাসবে নাই বা কেন? হাসিখুশি দিলদরিয়া আবার পরামর্শ দেওয়ার সময় তীক্ষধী পুরুষ আমার পিতামহাশয়। বাবার দৌলতেই পড়াশোনা শেখা। মেয়েদের পড়তে দিতে আমাদের সমাজে সবারই একটু খুঁতখুঁতানি আছে বটে কিন্ত বাবা এসব ব্যাপারে ডোন্ট কেয়ার। ফলে শৈশব পেরোনোর চৌকাঠেই আমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেলো এই দেশের যাবতীয় মহান লেখকের সাথে। অনুভব করতে শিখলাম তাদের আদর্শ। লক্ষ্য করে দেখলাম কিভাবে তাদের লেখা আস্তে আস্তে মানুষের দিকে আঙুল দেখাচ্ছে। ঈশ্বর নয়,পরলোকের কচকচি নয় - জানাচ্ছে ইহজগতে ভালো থাকার কথা। রাজধানী থেকে বহুদুরের এই গাঁয়ে সম্রাট ও তার পারিষদবর্গের বিলাসবহুল জীবনের সব কিংবদন্তি আমাদের কানে আসতো। দারিদ্যকে চোখের সামনে দেখতাম। রাজ কর্মচারীদের অত্যাচার দেখতাম। কিন্ত এসবই তো দেখে এসেছি আমরা বিগত বহু বছর ধরে। তার মধ্যে নতুন কিছু নেই। কিন্ত আমার বয়েস যখন এগারো কেমন যেন মনে হচ্ছিলো সবকিছু ঠিক আর আগের মতো নেই। এই অঞ্চলের মাটি চিরকালই উর্বর। তবুও কম ফলনের বছর দেখা দিতো। রাজকর দেওয়ার চাপে কৃষকেরা জমি জিরেত বা গৃহপালিত পশু বিক্রি করতো মানে আরো একটু গরীব হয়ে যেতো। আবার ভালো ফসলের বছরগুলোতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে হৃত সম্পত্তি কিছু পুনরুদ্ধার করতো।না পেলে দেবতার আলয়ে গিয়ে মাথা কুটতো। শান্তি পেতো। বা পেতোনা। কিন্ত এবারে দেখলাম ফসল ভালো হওয়া সত্বেও অত্যাচার যেন বেড়েই চলেছে। এই কর সেই কর। করের উপর কর ধার্য হওয়া। খাজনা দিতে দিতে সবার বেদম অবস্থা। মা এবং দিদি হঠাত এক হপ্তার অসুখে মারা যাওয়ার পর বাবা আমাকে আর বোনকে বোর্ডিং ইস্কুলে পাঠিয়ে দিলেন। বাবা তখন অন্য মানুষ। আগের বেপরোয়া লোকটা বদলে গিয়ে খিটখিটে গোছের হয়ে গেছেন। তাই আমরা খুব একটা উচ্চবাচ্চ্য না করে ইস্কুলে চলে এলাম। তবে ছোটবেলায় যে বইকে ভালবাসার বীজটা বাবা রোপন করে দিয়েছিলেন, কিশোরীবেলায় সেটাই ডালপালা মেললো বোর্ডিং ইস্কুলের বিশাল লাইব্রেরীটায়। কতদিন এমন হয়েছে যে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছি। আমাকে খুঁজে না পেলে সবাই একবার লাইব্রেরীতে ঢুঁ মেরে যেতোই। ও হ্যাঁ। বইয়ের সাথে এবার যুক্ত হলো খবরের কাগজ। রাজধানীর সাথে একাত্ম হতে পারলাম এবার। জানতে পারলাম সাগরপাড়ের কোন এক দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আমাদের গাম্বাট রাজা দেনার দায়ে প্রায় চুল বিকিয়ে বসে আছেন। তার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। পালাবার জায়গা নেই। রাজপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে পুরোহিত - বিকিয়ে আছে সবাই। কৃষক এক টাকা দিলে রাজার কাছে হয়তো পৌঁছচ্ছে ছয় আনা। সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত। রাজধানীতে নাকি ডাক্তার উকিল বড় দোকানের ব্যবসায়ীরা সম্রাটের কাছে আবেদন পাঠাচ্ছেন। কিন্ত কোন ফল হচ্ছেনা। সম্রাট বিলাসে মত্ত। সম্রাজ্ঞী রাজদরবারের ঠাটবাটে একটি আস্ত বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে বসে আছেন। পার্টিতে, মেহফিলে অভিজাতবর্গ ডুবে রয়েছে। ওদিকে মানুষ ন্যুব্জ হচ্ছে। আরো ন্যুব্জ। তবুও সবার বিশ্বাস ছিলো যে দেশের এই টালমাটাল সময় কেটে যাবে। হয়তো যেতও। ঠিক হয়ে যেতো আগের মতোই সবকিছু।

তারপর এলো দুর্ভিক্ষ।

              ***********

জেলখানা। রাত এখন বোধহয় তিনটে হবে। আমার চোখে ঘুম নেই। কিই বা হবে ঘুমিয়ে? বিপ্লবের কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার শাস্তি যে মৃত্যুদণ্ড সে তো আগে থেকেই আমার জানা। তাই যেটুকু সময় চেতনা আছে, এই মরজগতের স্বাদ চেটেপুটে নিতে চাই। ওরা আমার বিচার করেছে। বস্তুত বিচারের নামে জবানবন্দি চেয়েছে। জানতে চেয়েছে আর কে কে যুক্ত আছে এই ষড়যন্ত্রের পেছনে। বার বার। আমিও বারবার বলেছি যে এই হত্যার সম্পূর্ণ দায় আমার একার,আর কারুর নয়। ওদের বিশ্বাস হয়নি। একটা মেয়ে? একটা সামান্য বাইশ বছর বয়েসের মেয়ে, যার এদ্দিনে বিয়ে থা করে সংসার করার কথা নিদেনপক্ষে প্রেমিক জুটিয়ে ফুলে ঘেরা চিরবসন্তের স্বপ্নে দিন কাটাবার কথা সে কিনা একা ছুরি হাতে হত্যা করছে? তাও আবার এমন একজনকে যে অনেকের চোখে হিরো!! একটা মেয়ের ক্ষমতায় কেউ বিশ্বাসই করছিলোনা। স্বাভাবিক। গরীব ঘরের হলে তবু আলাদা,কিন্ত মোটামুটি স্বচ্ছল ঘরের হয়েও আমি কি কারনে এই ক্রান্তকালের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতরাবার কথা ভাবলাম সেটা সবার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো। বিচারক জিজ্ঞেস করলেন - আপনি এমন কাজ করলেন কেন?

- ও একটা আবর্জনা। এই দেশের জন্য। এই সমাজের জন্য। ঘরে আবর্জনা জমলে তাকে সাফ করতে হয়। আমিও করেছি।

- আপনি কি বিপ্লববিরোধী। গণতন্ত্র বিরোধী?

- আমি অমানবিকতার বিরোধী। নিষ্ঠুরতার বিরোধী। বিপ্লবের নামে যে হত্যালীলা চলছে তার বিরোধী।

- আপনি তো অভিজাত পরিবারের মেয়ে। এটাই কি স্বাভাবিক নয় যে নতুন দিনের যে সূচনা আজ হয়েছে, রাজতন্ত্র অভিজাত ও যাজকতন্ত্রের যে সমাপ্তি এই দেশের মানুষ দেখতে চাইছে আপনি তার বিরোধী?

- প্রথমত, আমি যে অভিজাত পরিবারে বড় হয়েছি, তার মধ্যে " আভিজাত্যের " আর বিশেষ কিছু বাকী ছিলোনা। আমার পরিবার কোন সাধারন মানুষের ক্ষতি করেছে এমন কোন ঘটনা যদি মহামান্য আদালত পেশ করতে পারে তো করে দেখাক।

দ্বিতীয়ত, নতুন দিনের যে সূচনা হয়েছিলো তাতে সবার মতো আমিও অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। হ্যাঁ,একজন তথাকথিত " অভিজাত " পরিবার হওয়া সত্বেও। অভিজাত পরিবার বা গরীব পরিবারে জন্ম নেওয়া কারুর হাতে তো নেই। সুতরাং সেই মানুষ তার জীবন কিভাবে পরিচালিত করছে,সেটাই দেখা উচিত। আপনারা যে " লিবার্টি" বলেন সেখানে পরিবারতন্ত্রকে অস্বীকার করা হয়। কিন্ত আমার ক্ষেত্রে তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারন দেখানো হচ্ছে কেন?

- প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না মাদাম। আপনি এই নতুন সময়ের বিরোধী কিনা স্পষ্টভাবে বলুন।

- না। আমার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তা আছে। আমি আগেই আপনাকে বলেছি,সেটা কি। সেই মতের সাথে আপনাদের মিল না হওয়া আপনাদের সমস্যা। আমার নয়।

- সেই মত যদিও সামাজিক পরিকাঠামোর মধ্যে অভিজাতশ্রেণীর অন্তর্ভুক্তিকেই বোঝায়।

- ঠিক। এই দেশে বহু মানুষ আছেন যারা অভিজাত বংশের হওয়া সত্বেও সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা এখন ভয়ে লুকিয়ে আছেন। তাদের এই বিপ্লবের সাথে যুক্ত করলে শক্তি বাড়তো। কিন্ত সাদা আর কালো ছাড়া আপনাদের তো আর কিছু চোখেই পড়েনা।

সহকারী বিচারক একজন কুতকুতে চোখের সন্দিগ্ধ গোছের লোক। ঘড়ঘড়ে গলায় তিনি বল্লেন - আমাদের মহান বিপ্লবী সাংবাদিককে হত্যা করার ফল কি হতে পারে জেনেও আপনি এগিয়ে এলেন কি সাহসে?

- একজন মারা যাবে,কিন্ত এক হাজার জন বাঁচার সুযোগ পাবে। তাদের মধ্যে হয়তো আপনারাও থাকবেন মহামান্য বিচারকেরা। সেই আশায়।

এই মন্তব্য শুনে সভাকক্ষে মৃদু গুঞ্জন উঠলো। এমন কি কয়েকজন হাততালি দিয়ে উঠলেন। কিন্ত কারুর মুখ দেখা গেলোনা। আমার প্রত্যুত্তরে বিচারকমন্ডলী একে অপরের দিকে অস্বস্তিজনক ভাবে তাকিয়ে তড়িঘড়ি হাতুড়ি পিটিয়ে আজকের মতো আদালত মুলতুবি করলেন।

প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে জেলখানায় ফেরার সময়ে দেখি লোকজন আমার দিকে ঠিক ততটা ঘৃণার চোখে তাকাচ্ছেনা। সত্যি বলতে কি গত দশ মাসের নিরবিচ্ছিন্ন  এই অভিশপ্ত লগ্নের কথা ভাবলে যে কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের বমি আসবে। কিন্ত খেটে খাওয়া সমাজের এক্কেবারে নীচের স্তরের জনগন? বহু বহু বছর ধরে পিষে পিষে এমন খেপিয়ে তোলা হয়েছে যে রক্তের খিদে ওদের আর মিটছেনা। আর এই রাজনৈতিক দল সেটা মেটাতে তো দিচ্ছেই না বরং আরো ধুনো দিচ্ছে তাতে। সেই ঘৃণার আগুন খারাপ ভালো কোনকিছুই দেখছে না,শুধু গ্রাস করে চলেছে। সেই তালিকায় যেমন উঠে আসছে অর্থগৃধনু জমিদারের নাম, তেমনি জ্ঞাণতাপস বিজ্ঞানীর নামও। আমার কাছে সান্তনা এটুকুই - এই বুভুক্ষু রাজনীতির পালে কলমের হাওয়া যিনি দিতেন সেই বিকৃতমস্তিস্ক কে আমি চুপ করিয়ে দিয়েছি।

তৃতীয় দিনের বিচারের পর রায় ঘোষনা হলো। বিরোধীপক্ষের কারুর নাম না পেয়ে হতাশ আদালত রায় শোনালো ভীড়ে ঠাসা কক্ষে। জনতা উল্লাস করে উঠলো। দু একটা হাহাকার ধ্বনি হয়তো উঠেছিল। আমি শুনতে পাইনি।

আগামী কাল আমায় শাস্তি দেওয়া হবে।

আমার শাস্তি : শিরোচ্ছেদ।

            **************

প্রথম বছরে ফসল ভালো না হওয়ায় সবাই চিন্তিত ছিলো। দ্বিতীয় বছরেও সেই একই ব্যাপার হওয়ায় চেপে বসলো ভয়। তৃতীয় বছরের ভয়ঙ্কর শীতের দীর্ঘ রাতে আগুনের চারিদিকে বসে কাঁপতে কাঁপতে সবাই বুঝতে পারছিলো যে আর রক্ষা নেই। গৃহপালিত পশু মারা যেতে শুরু করলো সেই অকল্পনীয় ঠান্ডায়। বরফে ঢাকা আপেল বাগান, তুষারের আবরনে মোড়া যব বার্লির ক্ষেত দেখে বুঝতে বাকী রইলো না যে দুর্ভিক্ষ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।এ অঞ্চলে রুটি মাংসের অভাব সেভাবে হয়নি কখনো। এইবারে মাংস তো দুরস্থান, মোটা বাসী পাঁউরুটি পর্যন্ত হলো অমিল। যে টাকায় পাঁচটা রুটি পাওয়া যেতো,সেখানে দুটো হয় কিনা সন্দেহ। তাও যদি যোগান ঠিকঠাক থাকে। এর মধ্যেও সাধারণ মানুষ কোনক্রমে টিঁকে যাচ্ছিলো,কিন্ত তার সাথে জমা হোলো বিশাল করের বোঝা,যা কমানোর কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছিলোনা সরকারপক্ষ থেকে। সবকিছু মিলিয়ে গ্রামগুলোতে ত্রাহি ত্রাহি দশা। শহরের অবস্থাও তথৈবচ - জানা গেলো সংবাদপত্র মারফত। একজন মজুরের আয়ের বারো আনা বেরিয়ে যাচ্ছে শুধু রুটি কিনতে। জনতা বিক্ষুব্ধ। রাজতন্ত্র অবিচলিত। অর্থমন্ত্রী ভালো কিছু করতে গেলেও নাকি সম্রাট বাধা দিচ্ছেন।

এখন ভাবতে অবাক লাগে যে সংবাদপত্র   কিভাবে এই রাজবিরোধী খবর নির্ভয়ে ছাপতে পারছিলো!! আসলে এটাই সেই সময় যখন রাষ্ট্রকে কেউ ভয় পাচ্ছিলোনা। রাষ্ট্র একজনের চুলের মুঠি ধরতে গেলে অন্য আরেকজন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিলো আর শাসনদন্ড মাথার উপর বনবন করে ঘোরানো ছাড়া শাসক আর কিছুই করতে পারছিলোনা তখন। এই সেই সন্ধিক্ষন যার অপেক্ষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যায়। রাজধানী থেকে বহুদুরে আমাদের গ্রামেও সেই জাদু সময়ের ঢেউ এসে লাগছিলো। অভিজাতদের দিকে দৃষ্টি হয়ে উঠতে লাগলো বাঁকা। যাজকদের আহৃত ধনসম্পত্তি ভগবানের কাজে না লাগিয়ে মানুষের কাজে লাগানোই ভালো - হাওয়ায় ভাসতে লাগলো এই মত।

এসবের মধ্যেও আমি হয়তো গড়পড়তা মেয়েদের মতোই সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া গা ছমছম দিন কাটিয়ে যেতাম। জীবনে প্রথম ছেলেদের চোখের ভাষা বুঝতে পারছিলাম। দেহে এবং মনে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিলো। তাই দেশ যে এমন একটা ডামাডোলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে পেরে হাল্কা রোমাঞ্চ হচ্ছিল কিন্ত তার সাথে নিজেকে একাত্ম করার কোন তাগিদ পাচ্ছিলাম না।

সেই তাগিদটা এলো আমাদের গ্রামে কিছু নতুন চরিত্রের আবির্ভাব হওয়ার পর। তাদের  কেউ এসেছে রাজধানী থেকে,কেউ বা অন্যান্য শহরের। তাদের বক্তব্য ক্ষুরধার, কন্ঠস্বর দৃপ্ত আর বক্তব্য দ্বিধাহীন। তাদের একটাই কথা : যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়।

এদের মুখেই আমি প্রথমবার নতুন একটা শব্দ শুনলাম। সেটা শোনার এবং তার অর্থ বোধগম্য হওয়ার পর থেকে আমার মধ্যে কেউ যেন শীতঘুম ভেঙে জেগে উঠলো। এই শব্দটা এরপরে আরো অনেকবার ব্যবহৃত হবে। বক্তৃতায়, লোকমুখে এমনকি যে লোকটাকে আমি খুন করলাম তার সম্পাদকীয়তেও। বারবার শুনে শুনে সেই শব্দটা ক্লিশে হয়ে যাবে। তার ঝাঁঝ কমে যাবে। কিন্ত সেই সময়ে, সেই জাদু সময়ে,শব্দটা শুনলেই দেহের মধ্যে রিনরিন করে উঠতো।ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঈশ্বর ভজনা করে তারপর নিদ্রামগ্ন হওয়াই নিয়ম। আমি ঈশ্বরকে ডাকতাম না আর। ঠোঁট নড়তো। মা ভাবতো ভগবানকে ডাকছি আর আমি অস্ফুটে ওই শব্দটাই জিভের মধ্যে চিনির ডেলা ঘোরানোর মতো বারবার বলতাম। আমার মন্ত্র। আমার প্রার্থনা।

- বিপ্লব!! বিপ্লব!! বিপ্লব!!!

সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ দিনটা রোদ ঝলমলে দেখে যাবো। কপাল মন্দ। এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে যেতে হবে। আমাকে লাল রঙের আংরাখা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিছুক্ষন আগে।বিশ্বাসঘাতকদের এটাই পরানোর নিয়ম। সেই পরে সং সেজে বসে আছি মৃত্যুর অপেক্ষায়। ওহ হ্যাঁ,একটা মজার কথা বলতে ভুলে গেছি। এর মধ্যে আমি একটা ছবি আঁকিয়ে নিয়েছি নিজের। ব্যাপারটা আদতে ভারী মজার। কোর্টে যখন আমার শুনানীর যাত্রাপালা চলছিল তখন একজন সেনা অফিসার ( আমাকে দেখে তার কি মনে হয়েছিল কে জানে) আমার কিছু স্কেচ করতে শুরু করে। কাঠগড়া থেকে আমি তা লক্ষ্য করেছিলাম। বেশ ঘাড় বেঁকিয়ে টেকিয়ে খসখস করে পেন্সিল বুলিয়ে যেতো আর আমার দিকে তাকাতো চোরাগোপ্তা। আদালতের গম্ভীর দমবন্ধ করা পরিবেশে সে এক আজব দৃশ্য। দু একবার চোখে চোখ পড়াতে বিব্রত হয়ে মাথা টাথা নামিয়ে নিতো। শুনানি শেষ হবার পরে আমি ওই চোখের দিকে তাকিয়ে এক সমুদ্র ঘৃনার মাঝখানে এক আঁজলা মিঠে জল দেখতে চেয়েছিলাম।

কি দেখেছিলাম ?

সে প্রশ্ন থাক।

আদালতের কাছে এর পরেই আমি আপিল করি, যদি আমার একটা পোট্রেট করবার অনুমতি পাওয়া যায় তো মৃত্যুর আগের সময়টুকু অতোটা দুর্বিষহ লাগবেনা। আদালত অনুমতি দিলো এবং জানতে চাইলো এমন কেউ আছে কিনা। আমি সটান আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলাম বাবাজীর দিকে। সে তখন কাগজ পেন্সিল এক হাতে আর গাদা বন্দুক আরেক হাতে নিয়ে গুটিগুটি নিজের পথ ধরতে ব্যস্ত। বিচারপতির ডাক শুনে বেচারা ভির্মি খায় আর কি। আমি পাবলিকের শত্তুর বলে কথা। এইরকম রোমহর্ষক মামলায় কেউই চায় না তার নাম জড়াক। যাইহোক অনেক বুঝিয়ে শুঝিয়ে তাকে যখন জানানো হলো আহ্বানের কারন তিনি তো  একপায়ে খাড়া হয়ে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম ব্যাটাকে বেশ প্যাঁচে ফেলা গেছে। ও মা!!! এ তো দেখি বাড়ি দেখে ইজেল আর ক্যানভাস নিয়ে হাজির। কি আর করা কাঠ হয়ে সেপাইবাবুর সামনে বসতেই হোলো। জানলাম ওর গল্প। দেশের দক্ষিন ভাগের সমুদ্রঘেঁষা এক ছোট্ট বন্দরে ওর বাড়ি। বাপ নাবিক এবং তুখোড় মাতাল। মা অন্য লোকের সাথে ভাগলবা। তিন ভাই এক বোনের সংসারে অভাবের নিত্য চাবুক। দেশের সৈন্যবাহিনী কাজ যোগাড়ের চেষ্টায় ছেলেটা রাজধানীতে এসেছিলো। যেমন আরো হাজার হাজার আসে। এসেই দিনবদলের ঝোড়ো সময়ের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। ওর রাজার ওপর বিশেষ বিরাগ নেই। আবার ভালবাসাও নেই। মোটামুটি দুবেলা পেট চললেই সে অস্ত্র হাতে তুলতে রাজী। বিপ্লব এবং তার পরবর্তী ভানুমতী কা খেল তাকে অফিসার পদে বসিয়ে দিয়েছে।

- রাজামশায়ের মুন্ডুটা যখন সবাইকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছিলো - আমিও খুব হাততালি দিচ্ছিলাম । তারপর বিকেল থেকে কি বমি!! কি বমি!! আসলে রক্ত খুব একটা সহ্য করতে পারিনা জানেন। "

বিষন্ন ভাবে বললো জন।

- তাহলে সৈন্যবাহিনীতে যুক্ত হলেন কেন?

- খুব দ্রুত টাকার দরকার ছিলো। আর কোন চাকরী পাচ্ছিলাম না। তাই,,,।

- আর এই ছবি আঁকা?

কারাগারের ছোট্ট ঘুলঘুলি থেকে আসা তেরছা আলোর রশ্মির দিকে তাকিয়ে জন বললো - আমার এক তুতো কাকা আছে। মানে ছিলো আর কি। পাত্তা নেই তো নেই। তারপর দুম করে একদিন হাজির হোলো একগাদা টাকা নিয়ে। সে টাকা কোত্থেকে যোগাড় হতো কেউ জানেনা। অভাবের সংসারে অত কৌতুহলে লাভ কি। বাবা তখন বাড়িতে থাকলে ভালোই। না থাকলে তো দুনি মজা। কাকা নানারকম ফিকির জানতো। যার মধ্যে এই একটা। কাকার পাশে বসে বসে আমারও শখ হোতো তুলির আঁচড় কাটি। সেই থেকেই শুরু।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম জনের দিকে। কি হওয়ার কথা ছিলো ছেলেটার আর কি হয়ে গেলো। হয়তো ঝোড়ো সময়ের দস্তুরই এমনটা। মানুষের পথ বদলে দেয় রাতারাতি।

- তুমি এই পথ বেছে না নিয়ে যদি পড়াশোনার দিকে যেতে, তাহলে হয়তো সবার পক্ষেই ভালো হোতো, তাই না?

জন জিজ্ঞেস করেছিলো আমায়।

- হ্যাঁ,সে তো হোতোই। তুমি বেশ ছবি টবি আঁকতে আর আমি ভারী ভারী বই পড়ে...।

বলেই নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। আমার গালের লালিমা কি জন দেখতে পেয়েছিলো?


বৃষ্টি পড়ছে। পড়েই যাচ্ছে। তাতে ধুয়ে যাচ্ছে রক্ত, ক্লেদ, বঞ্চনা। মাথাচাড়া দিচ্ছে নতুন দিনের অংকুর। বিপ্লবের চারাগাছ।


কিন্ত যে শিল্পীর জীবন যুদ্ধবাজে বদলে গেলো অথবা যে মেয়েটা পড়াশোনা নিয়ে থাকার বদলে হয়ে গেলো ঘাতক - সেই নষ্ট জীবনের ভার কোন বিপ্লব বইবে?

একদিকে মহিয়সী একজন নারী। অন্যদিকে ক্ষমতালিপ্সু জনগণেশের হাততালিতে আঙুল ফুলে কলাগাছ এক পিশাচ। লড়াইটা ক্রমে এই জায়গায় চলে এসেছিলো। রাজতন্ত্রের নাগপাশ থেকে বেরোন একধাপে হয়নি,বলাই বাহুল্য। তার মধ্যে অনেক আগুপিছু,অনেক রক্ত ঝরা দিন আমরা দেখেছি। দেখেছি বহুযুগ ধরে চেপে রাখা মানুষের ক্ষোভ কিভাবে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বসিয়ে দিতে পারে দুর্গের প্রাচীর। দেখেছি " চুনোপুঁটি " লোকদের সাথে বসবাস করতে না পারা রাজপরিবার কিভাবে সুড়সুড় করে ফিরে আসতে পারে নোংরা রাজধানীতে। এ সমস্তই আমরা সংবাদপত্রে পড়তাম।কিন্ত সেই একই বর্ণনা যে নারীর মুখে শুনে আমার গোটা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতো, প্রথম বার তাকে দেখি ষোলো বছর বয়েসে। মহিলাদের ভূমিকা আমাদের সমাজে খুব একটা পাতে দেওয়ার মতো নয়। ইনি সেইখানে উদিত হলেন নিজের তেজে। প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ, ওজস্বী সব বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগলেন দেশময়। তার বক্তব্য ছিলো সোজাসাপ্টা। সাধারণ মানুষের জন্য চাই সাধারণ মানুষের সরকার। কিন্ত সরকার স্থাপন হবে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ ভাবে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমের গণতন্ত্রের কথা তিনি বারবার উল্লেখ করতেন। আমরা সেই ঐতিহ্য সাময়িক ভাবে ভুলেছি মাত্র - কিন্ত আবার তা পুনরুদ্ধার করা যায়। শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে নবজাগরণ হলে রাজনীতিতেও বা হবেনা কেন?

- আমরা চাই রিপাবলিক। চাই রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি। আর অন্য কোন পন্থা নেই। ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্ন আমি আপনি সবাই দেখেছি, তা আজ আমাদের চোখের সামনে বাস্তব হয়ে উঠছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? এখন - এই সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে আমাদের জানতে হবে কি ভাবে তা আমাদের করায়ত্ত হতে পারে।

মাদামের বক্তব্য শুনতে লোকে ভীড় করে আসতো। তার কন্ঠস্বরে ছিলো এমন কোন জাদু যে লোকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো।
আমিও শুনতাম। তার কথা এবং তার লেখা পড়ে আমি তার ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। দু:খের কথা, যে তার এবং বিপ্লবীদের সাচ্চা সমর্থকদের প্রভাব আমাদের দেশে ক্রমশ আলগা হতে থাকলো।

কেন? জনপ্রিয়তার ধান্দা করা রাজনীতি তারা করতেন না বলে। দেশের টালমাটাল সময়ে যথাসম্ভব কম রক্তপাতে সাধারণ মানুষের হাতে কিভাবে ক্ষমতা  আনা যায়,তাদের ছিলো সেই প্রচেষ্টা। কিন্ত  মানুষ? তারা চাইছিলো উত্তেজনা। তাই আস্তে আস্তে স্থান দখল করে নিলো কিছু ধান্দাবাজ এবং বিকৃত লোক যারা শুধু পোড়াতে ভালোবাসে। বিপ্লবকে সামনে রেখে তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে একের পর এক নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ফরমান জারি করতে শুরু করলো। আর সেই মৃত্যু পরোয়ানা তৈরিতে যার সবচেয়ে বড় হাত তিনি ছিলেন এক সাংবাদিক।  নানা রকম দিক থেকে জোগাড় করতেন নাম, যারা নাকি বিপ্লবী আদর্শের পরিপন্থী, যারা রাজতন্ত্রের গোপন সমর্থক। তাদের টেনে হিঁচড়ে আনা হোতো রাজধানীতে। হতেন কারারুদ্ধ। চলতো অত্যাচার। সে অবধি ঠিক ছিলো। কিন্ত ইদানীং অধিকাংশ অপরাধের শাস্তি একটাই। মৃত্যুদণ্ড। অপরাধও একটাই। বিশ্বাসঘাতকতা। সেই বিশ্বাসঘাতকের লিস্টি তৈরি করছেন কে? সেই সাংবাদিক। একেক দিনের কাগজে নতুন লিস্ট বেরোয় আর অপরাধীদের মুন্ডুগুলো গড়াগড়ি যায়। আমি, আমার দেশের মানুষ, বর্তমানে ঠিক এইরকম রক্তাক্ত সময়ে বাস করছি।

তবুও মেনে নিচ্ছিলাম। যা হচ্ছিলো, ঠিক হচ্ছিলো না একেবারেই। তবুও হাজার হাজার সাধারণ মানুষের মতো আমিও নিয়তিবাদী হয়ে মেনে নিচ্ছিলাম সেইসব। আমার ব্যক্তিগত সেই নির্লিপ্ততা একদিন ছারখার হয়ে গেলো।

মাদাম, দেশের মানুষকে প্রাণপণে ভালোবাসতেন যিনি, প্রতি মূহুর্তে রিপাবলিকের স্বপ্ন বুকে নিয়ে জেগে থাকতেন যিনি - গ্রেপ্তার হলেন বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে।

 একটা নয় ইঞ্চির ছুরি। ফলাটা চকচক করছে মোমবাতির আলোয়। আর আমি সেই সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে ভাবছি, কাল একজন মানুষকে হত্যা করতে কি সত্যিই পারবো? মাদাম নিজে কি চাইবেন? তিনি এই জাতীয় প্রতিশোধ রাজনীতির বিরোধিতাই তো করে এলেন। তার গ্রেপ্তারীর বদলা কি হত্যা দিয়েই নিতে হবে? আরেকটু তলিয়ে ভাবার ফলে অবশ্য এই সঙ্কট আস্তে আস্তে মুছে যেতে লাগলো। মাদামের গ্রেপ্তারী তো একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমার জেহাদ তো তাদের বিরুদ্ধে যেখানে কয়েকজন মানুষ রিপাবলিকের নামে শেষমেষ ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে।

বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন - এই হত্যাকান্ডের শাস্তিস্বরুপ তুমি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হতে পারো। তবুও করলে কেন?

উত্তর দিয়েছিলাম - একজনের মৃত্যুর বিনিময়ে এক হাজার জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা লজ্জার নয়, বরং গর্বের কাজ।

রাতে ঘুমোতে পারলাম না উত্তেজনায়।

পরদিন সকাল। সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে সাংবাদিক মশায়ের বাড়ির পথ ধরলাম। যে সরাই খানায় উঠেছিলাম তার থেকে বাড়িটার দূরত্ব হেঁটে মিনিট পনেরো। গাউনের ভাঁজে লোকানো আছে ওকে হত্যার পরোয়ানা। ডানহাতে রয়েছে একটা চিঠি। হ্যাঁ,ঠিকই শুনেছেন। চিঠি। অবাক হবেন না। কোন প্রেমপত্র নয়। ওই নচ্ছারকে জব্দ করার উপায় অন্য। ওই চিঠির মধ্যে একটা লিস্ট রয়েছে। বিশ্বাসঘাতকদের লিস্ট। সাংবাদিক আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ এখন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো বলির পাঁঠা খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিরোধীতার গন্ধ পেলেই তাকে রাষ্ট্রীয় মদতে খুন করা হচ্ছে। রাজ্য জুড়ে গুপ্তচর ছড়ানো। তারা অসন্তোষের জল মেপে বেড়াচ্ছে। কোথাও একটু বেচাল দেখলেই জানানো হচ্ছে রাজধানীতে বসে থাকা স্বঘোষিত " দেশোদ্ধার কমিটি" কে আর রক্তে ভেজানো জল্লাদের মঞ্চ হয়ে উঠছে আরো একটু রাঙা।

এই লিস্ট হচ্ছে আমার ছাড়পত্র। নামগুলো অবশ্যই ভুয়ো। ওটা শুধু লোকটার নাগালের মধ্যে যাওয়ার জন্য। এরকমই লিস্ট ও নিজের ছাপানো কাগজে বড় বড় অক্ষরে বের করে। হইচই পড়ে রাজ্য জুড়ে। লিস্টের মধ্যে যাদের নাম, যমরাজের খাতায় তাদের সইসাবুদ মোটামুটি পাকা। তাদের খোঁজে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়। সাধারণ মানুষও সোল্লাসে যোগ দেয় তাতে। ধরা পড়লে বিচারের প্রহশন আর কয়েক হপ্তার মধ্যেই ধড় একদিকে মুন্ডু আরেকদিকে। সীমাহীন বীভৎসতা রাজধানীর আকাশে কালো শকুনের মতো ডানা মেলে আছে এখন।

আমি আজ ওই শকুনের চোখকে উপড়ে ফেলবো।

বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম। একটা  কাজের ঝি উঁকি দিলো।

- কি ব্যাপার?

- আমি মঁসিয়ে মারাটের সাথে দেখা করতে এসেছি।

ঝিটা তার কুতকুতে চোখে আমাকে আপাদমস্তক দেখে বল্লো - বাবু এখন ব্যস্ত আছেন। বিকেলে এসো। পাঁচটার পর।

- একটা জরুরি কাগজ দেওয়ার আছে।

- আহহ। বল্লাম না বিকেলে এসো। বাবু এখন গায়ে ওষুধ মাখছেন। সাথে লেখালিখিও কচ্ছেন। এখন দেখা হবেনা।

সেরেছে। তীরে এসে তরী ডুববে নাকি! ছক কাটা পরিকল্পনা কি একটা ঝিয়ের জন্য ভেস্তে যাবে!

আমার ভাগ্য ভালো যে ঠিক সেই সময়ে ভেতর বাড়ি থেকে কেউ ঝি টাকে ডাকলো

- কি ব্যাপার রে সোফিয়া?

পুরুষ কন্ঠ।

- দ্যাকেন না, কে ঝ্যানো একটা ছুঁড়ি এসেচে বাবুর সাথে দেখা করবে। সাথে কি লিস্টি,,,

- ডাক ডাক,, ভেতরে ডাক!!

ঝি থতমত ভাবে দরজা খুলে দিলো।

দরজার ওপারে ছোট্ট একটা খোলা জায়গা। হাবিজাবি কাগজ পত্তর ডাঁই করে রাখা আছে। বাঁদিকে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন আধবুড়ো লোক।

- কি নাম আপনার?

নাম বললাম। ভুয়ো অবশ্য। কোত্থেকে এসেছি সেটাও বল্লাম।

- কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার আছে মঁসিয়ে কে।

- আমাকে দিয়ে যেতে পারেন। আমি যথাস্থানে পৌঁছে দেবো।

ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বল্লেন। এই ঝামেলার জন্য অবশ্য তৈরিই ছিলাম।

- দু:খিত। আমার উপর নির্দেশ আছে লিস্ট ওনাকেই দেওয়ার।

- আমি ওনার সচিব। আমাকে নির্দ্বিধায় দিতে পারেন।

- মাপ করবেন। নির্দেশের বাইরে যেতে পারবোনা।

লোকটা সরু চোখে তাকালো আমার দিকে। ঠিক পাঁচ সেকেন্ড। আমি দৃষ্টি সরালাম না। ওনার বিশ্বাসের উপর নির্ভর করছে সব। 

- বেশ। তবে আমাকে আগে ওনার অনুমতি নিতে হবে। অপেক্ষা করুন।

বসলাম একটা গার্ডেন চেয়ারে। কয়েকটি রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত কেটে গেলো। দুয়েকজন প্রেসের লোকজন দেখলাম ব্যস্তভাবে কাগজ পত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। পাশের বাড়ি থেকে হঠাত আর্তনাদ ভেসে এলো একটা। চমকে উঠতেই সামনে দিয়ে একজন কর্মচারী যেতে যেতে বলল - সকাল থেকে এই নিয়ে পাঁঁচবার।

- মানে,এটা কি হচ্ছে,,,,

আমি কিন্তমিন্ত করে জিজ্ঞেস করলাম।

- ওই দাঁত তোলা হচ্ছে আর কি। দাঁত থাকলেই দাঁত ব্যথা হয় কি না।

বোঝ কান্ড। আমি ভাবলাম সাংবাদিক মশাই বোধহয় বাড়ির পাশে উতপীড়নের ঘরও খুলেছেন। গলা শুকিয়ে এসেছিলো উত্তেজনায়। একজনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম একটু জলের জন্য। সে বিরক্তিভরা মুখে " দেখছি " বলে কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো কে জানে। নিজেই উঠে খোঁজ করতে যাবো কিনা ভাবছি ঠিক তখনি -

 আপনি চলে আসুন।

বুকটা ধক করে উঠল। কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়ালাম। আমি তো আর পেশাদার খুনী নই যে ঠান্ডা মাথায় কাজ সেরে গা ঢাকা দেবো। হাত দিয়ে অনুভব করে নিলাম ছুরিটা ঠিকঠাক আছে কিনা। তারপর এগোতে লাগলাম।  সিঁড়িটা যেখানে শেষ হচ্ছে তার ঠিক পরেই একটা অনতিউচ্চ দরজা রয়েছে। সেখান থেকেই ওই আধবুড়ো সচিব ডাকছেন আমায়।

- এই করিডর ধরে সোজা চলে যান। মঁসিয়ে এখন ওষধি নিচ্ছেন। স্নানঘরে।

স্নানঘরে? দেশের ভালো করার জন্য শেষে পুরুষ মানুষের স্নানঘরে ঢুকতে হবে?

ভদ্রলোক বোধহয় আমার মানসিক অবস্থা বুঝলেন। আশ্বাস দিলেন যে ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। একটা বাথটবের মধ্যে উনি নিজেকে ডুবিয়ে রেখে সারা শরীরে ওষধি নিচ্ছেন। নাকি চর্মরোগ ঠিক করার দাওয়াই এটা।

- করিডরের শেষে, বাঁদিকে একটা ছোট দরজা আছে। ওখানেই ঢুকে যাবেন। এই চর্মরোগের কারনে মঁসিয়ে আজকাল লোকজনের সামনে আসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। সারাদিন ওখানেই প্রায় থাকেন। মেজাজও খিটখিটে হয়ে গেছে।

" পাপের ফল "। মনে মনে ভাবলাম।

দ্বিধান্বিত পদক্ষেপে ঢুকলাম স্নানঘরে। সারা ঘরে জমে আছে একটা সব্জেটে অন্ধকার আর ওষুধের গন্ধ। ঘরের ঠিক মাঝখানে জ্বলছে মোমবাতি। সেই মোমবাতির কাছেই লম্বালম্বি গোছের অদ্ভুত আকারের একটা কাঠের বাথটব। সেখানেই অর্ধ নিমজ্জিত অবস্থায় সারা মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে খসখস করে লিখে যাচ্ছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মহান ত্রাতা, রাজশক্তির যম, পরমপুরুষ মঁঁসিয়ে পল মারাট।

ঘরে আমার পায়ের শব্দে তিনি ফিরে তাকালেন। " শকুন " বিশেষণ সত্যিই খাটে ওই মুখশ্রীর সাথে। আস্তে আস্তে ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার ডান হাতে লুকিয়ে রেখেছি ছোরা। বাঁ হাতে পাকানো কাগজটা।

- কই,দেখি কি লিস্ট।

আমি ওনার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালাম।

- কি ব্যাপার?

- মাদাম কি দোষ করেছিলেন?

- কি?

- কেন আপনি তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এনেছেন? নীচ,প্রবঞ্চক, মিথ্যাবাদী!! আমি দাবী করছি, এই মূহুর্তে আপনি ওনার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করবেন!

আমি জানি না কেন ওই কথাগুলো বলেছিলাম। হয়তো মানুষ খুন করার মতো চরমপন্থার প্রতি তখনও মন সায় দিচ্ছিলো না।

লোকটা খানিক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। তারপর ওর মুখ ভরে উঠলো কুটিল হাসিতে।

- ওহহ। এটা একটা ফাঁদ। বাব্বা। সাহস আছে বলতে হবে আপনার। মাদাম দেখছি মাথাটা ভালো করেই ধোলাই করেছেন। এখান থেকে হাতে হাতকড়া পরে বেরোতে হবে, সেটা বুঝতে পারছেন কি?

- আপনি মাদামকে মুক্ত করার সুপারিশ করবেন কি না!!!

আমাকে একবার আপাদমস্তক মেপে নিয়ে আবার লেখার দিকে মনোনিবেশ করে লোকটা বললো - আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। চুপচাপ কেটে পড়ুন। আর একটা কথা বললে পেয়াদার দল আপনাকে এখান থেকে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাবে। নেহাত কচি বয়স,নইলে এই সুযোগটাও দিতাম না।

হঠাত খুব দুর্বল লাগলো নিজেকে। শরীরের সব শক্তি যেন কেউ নি:শেষে শুষে নিয়েছে। দরজার দিকে এক পা কি বাড়িয়েও দিয়েছিলাম। লোকটা বেঁচে যেতো। আমিও ভগ্নমনোরথ হয়ে গ্রামে ফিরে আসতাম। কিছুই হতো না আর, যদি না  হঠাত ও বলে উঠতো -

 আর হ্যাঁ শুনুন। আপনার মাদামের মুন্ডু যাতে শিগগির গড়াগড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়,আমি সেই চেষ্টাই করবো। সব এখন আমার অঙ্গুলিলেহনে চলে।

 মাথার মধ্যে দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। এত অহঙ্কার!! এত স্পর্ধা!!  ছোরাটা বের করলাম গাউন থেকে। একেবারে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালাম। লোকটা খেঁকিয়ে উঠে কিছু বলার জন্য মুখ তুলতেই আমার হাতে ছোরা দেখে কেমন ভেবলে গেলো। তারপর একটা বিকৃত মুখভঙ্গি করে চেঁচিয়ে উঠলো - বাঁচাওও!!! বাঁচাওওওও।

আর বিশেষ কিছু বলার সুযোগ ও পায়নি। ছোরাটা আমূল বসিয়ে দিলাম বুকে। প্রায় চোখ বন্ধ করে,আনাড়ির মতো। কিমাশ্চর্যম। এক আঘাতেই ইস্পাত লক্ষ্যভেদ করলো। ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে এসে বাথটব লাল করে তুললো এক মুহূর্তে । আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দৃশ্য দেখতে লাগলাম। ভয়ঙ্কর দৃশ্য। বীভৎস। আবার একই সাথে - তৃপ্তিদায়ক।

আজ আমার জীবনের শেষ দিন। সংক্ষিপ্ত জীবন। প্রায় শেষ পর্যন্ত গড়পড়তা , অন্য সবার মতোই জীবন। ব্যর্থ না সফল? সেটা ইতিহাস বলবে। কোনো অনুশোচনা থেকে গেলো কি? তা তো থাকলোই। বিপ্লব পরবর্তী আমার দেশ কি রকম হবে সেটা দেখার ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেলো। দক্ষিন সমুদ্রতটে যাওয়ার ভারী ইচ্ছে ছিলো। সেটাও বাকী থেকে গেলো। ওই যে ছেলেটা আমার ছবিতে শেষ তুলির টান লাগাচ্ছে, ওর সাথে আরো কিছু সময় কাটানোর ইচ্ছে ছিলো। তাও আর হবেনা।

- একবার দেখে যাবেন।

রুদ্ধকন্ঠে জন ডাকলো আমাকে।

ছবিটার কাছে গেলাম। বাহ!! তুলিতে ওর সত্যিই মুন্সিয়ানা আছে। আমি এমন কিছু আহামরি সুন্দরী নই বলেই ধারনা ছিলো। এখন দেখছি চলনসই সুশ্রী বলা যেতেই পারে। তবে এর মধ্যে কতটা বাস্তব আর কতটা জনের হাত সেটা অবশ্য বলা মুশকিল।

জনের দিকে এগিয়ে গেলাম।

- তোমার দক্ষিনাটা বাকী থেকে গেলো।

জন ম্লান হাসি হাসলো একটা।

- আগে বলুন পছন্দ হোলো কিনা।

আমি দু একটা ছোট্ট জায়গা বদলাতে বল্লাম। গালে আরেকটু লালিমা হলে ভালো হয় ( কোন মেয়েরই বা ইচ্ছে করে না এমনটা) আর চোখের রঙ,আমার ধারনায় আরেকটু গাঢ় হলে বেশ হয়।

- চোখের রঙটা বরং আমার পছন্দের থাক। ওটাই দক্ষিনা।

আমি নির্নিমেষে তাকালাম জনের দিকে। অন্য কোন সময়ে,অন্য কোন পরিস্থিতিতে এই পরিচয় কোথায় যেতো, কে জানে?

কারাগারের দরজা খুললো। সময় হয়েছে। চারজন রক্ষী এসে দাঁড়ালেন ভেতরে। আগে হয়তো পেছন পেছন একজন যাজকও আসতেন। এখন সেসব পাট চুকেবুকে গেছে। আমারও দরকার নেই।একটা লাল রঙের আংরাখা পরিয়ে দেওয়া হলো। বিশ্বাসঘাতকদের এটা পরতে হয়। তারপর একজন আধবুড়ো গোছের অফিসার এগিয়ে এসে বললেন - মাদাম শার্লট কোরদে,, মহামান্য জাতীয় আদালতের আদেশানুক্রমে, আমাদের সবার প্রিয় পিতৃভূমি ফ্রান্সের বিপ্লব প্রচেষ্টার মহান সংকল্পে বাধা দেওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজে নিয়োজিত হওয়ার জন্য তথা নবযুগের কান্ডারী, মণীষী জন মারাটকে নির্মমভাবে হত্যার জন্য আপনাকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেছেন।

আপনার কোন অন্তিম বক্তব্য আছে?

অফিসারটির সাথে একজন লিপিকার এসেছেন। সব ঘটনাবলি টুকে রাখা ওনার কাজ। তিনি অত:পর খাতা কলম নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। বলা যায়না,শেষ মুহূর্তে আমার সঙ্গীসাথীদের নাম বলে দিয়ে প্রাণ ভিক্ষাও তো চাইতে পারি।

আমি কারাগারের ছোট্ট জানালার বাইরে থেকে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর দিকে তাকালাম একবার।

- হায়, স্বাধীনতা....।

লিপিকার বাবু হতাশ হলেন।ব্যাস,এটুকুই?
অফিসার মশাইও বোধহয় মনে মনে মাথা চুলকোলেন একবার।

- বেশ। ইয়ে, তবে এবার,,,।

- চলুন। আমি প্রস্তুত।

উঠে দাঁড়ালাম। জন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বল্লাম - কি মশাই,মাদামকে বিদায় জানাবেন না?

ও ঝুঁকে পড়ে আমার হাত চুম্বন করল। তারপর সেই হাত ধরে কেঁদেই ফেললো ঝরঝর করে। আমি ওর মাথার চুল একবার ঘেঁটে দিলাম।

- ছবি আঁকাটা ছেড়োনা। আসি?

চলে আসা মাঝে মাঝে কত যে কঠিন,,,।

কারাগার থেকে বেরোতেই উন্মত্ত জনতার উল্লাস শোনা গেলো। পাঁচীলের ওপার এখন উত্তাল। আমাকে একটা খাঁচা গোছের গাড়িতে পোরা হোলো আমারই নিরাপত্তার জন্য। যদি আধলা ইঁট ছোঁড়ে কেউ? আমার মাথা ফাটবে। তখন আবার সুস্থ হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তদ্দিন প্রাণদন্ড পিছিয়ে যাবে। কম ঝামেলা? কদ্দিন ধরে সবাই অপেক্ষা করছে বিপ্লবের বরপুত্রের খুনীর পটল তোলা দেখার জন্য। এই আমোদে বাধা দেওয়া তো রাষ্ট্রীয় অপরাধ!

অঝোর বৃষ্টির মধ্যে খাঁচায় পোরা জন্তুর মতো আমাকে নিয়ে আসা হোলো বধ্যভূমিতে। চারিদিকে গালাগালি আর টিককিরির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। পচা ফল আর সব্জি ছোঁড়া হচ্ছে বারবার। আমার চোখ অবশ্য সামনের দিকে। সেখানে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে এ যুগের সবচেয়ে নিখুঁত হত্যার কল।

গিলোটিন।

এর নাম শুনলে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। হাজারে হাজারে নিরপরাধের প্রাণ মিলিয়ে গেছে এর অতিকায় মারণ জাতাকলের নীচে। অথচ আজ ওটাকে দেখে খুব একটা মারাত্মক কিছু মনে হোলো না।যেন ও নিজেও একটা পরিস্থিতির শিকার।

 বৃষ্টি নাছোড়বান্দার মতো পড়েই যাচ্ছে। আমি কি কাঁদছি? এই তোড়ের মতো জলের ভেতর বুঝতেও পারছিনা ছাই। বইয়ে পড়া বিষুব অঞ্চলে কি এরকমই বৃষ্টি হয়?

মঞ্চের উপর সাবধানে তোলা হোলো আমাকে। অত:পর হাত পা বেঁধে হেঁটমুন্ড করে শুইয়ে দেওয়া হোলো। আমার দৃষ্টিপথে এখন আর বিশেষ কিছুই আসছেনা। কানেও প্রবেশ করছেনা কোন উল্লাস,বক্তৃতা কিম্বা ড্রামবাদন যা কিনা মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ঠিক আগের মুহূর্ত অব্দি বাজানো হতে থাকে। শুধু বৃষ্টির শব্দ। তাই কি? কোথা থেকে যেন গরুর গলাতে বাঁধা ঘন্টার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। বাবার উঁচু গলায় হাসিও যেন কানে এলো ( আহা,,তিনি কি খবর পেয়েছেন)। খুব ভোরে ভেসে আসা পাখির ডাক,কনভেন্টের মাদাম সুপিরিয়রের জুতোর ঠকঠক- সব মিলে মিশে খুব সুন্দর এক শব্দলহরী। আমি তার মধ্যে ডুবে যেতে যেতে চোখ তুলে সামনের দিকে একবার তাকালাম। মুক্তির দেবী তার উন্নত চোখ আর মাণদন্ড হাতে নিয়ে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। তার কন্ঠে দৃপ্ত সঙ্গীত -

 Amour sacré de la patrie,
Conduis, soutiens nos bras vengeurs !
Liberté, Liberté chérie,
Combats avec tes défenseurs !

 আগুয়ান হও বন্ধু!!

পিতৃভূমির প্রেমে দৃঢ় হোক তোমার দু হাত!

একতা ও ভালোবাসাময় এই পতাকার নীচে

মুক্তি,মুক্তি - আহা পাই যেন মুক্তির স্বাদ!!!


আমি পরম শান্তিতে চোখ বুজলাম।






No comments:

Post a Comment