ভেরোচিও মাস্টারের আঁকার ইস্কুলে সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। হুলুস্থুল কান্ড। ছাত্রেরা সবাই রঙীন কাগজের সুতলি ঝোলাচ্ছে জানালায় দরজায়। কেক, ওয়াইন আর সুস্বাদু পাই সাজানো হচ্ছে অতিথিদের জন্য। দারুন সব তৈলচিত্রে চলছে ঝাড়পোঁছ। ফ্লোরেন্স শহরের মোটামুটি ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাতেই মাস্টারের স্টুডিও। এই ধুমধাড়াক্কা দেখে পথচলতি লোকজনও দাঁড়িয়ে পড়ছে মাঝে মধ্যে। কোচোয়ানরা গজগজ করছে। ভীড়ের ভেতর দিয়ে তারা ঠিক করে ঘোড়া চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না।
- " আইব্বাস!! আজ ইস্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস নাকি রে বাবা !!
এক পথচারী পাশের সব্জীদোকানের বুড়িকে জিজ্ঞেস করে।
- কে জানে । বড় বড় লোকের ব্যাপার....। বুড়ি ঠোঁট উলটোয়।
- অন্যদিন তো মান্যবর নিজেই আসেন দুপুরবেলা। আজ তো আমি দোকান খোলার আগেই হাজির!!
বাস্তবিক মাস্টারমশাই সকাল সকাল এসে গেছেন। অন্যান্য দিন একটু বেলা করে তিনি আসেন। ভয়ানক রকম পেশাদার নন, তবে ইজেল নিয়ে একবার বসে গেলে সব আলস্য লাফ দিয়ে পালায়। ছাত্রদের টেবিলে গিয়ে কড়া নজরে লক্ষ্য করেন রঙ আর রেখার কারুকার্য। তিনি এই শহরের অন্যতম সম্মানীয় একজন শিল্প শিক্ষক । বেশ কিছু প্রতিভাবান যুবক তার ছত্রছায়ে রয়েছেন, যাদের শেখানো হচ্ছে চিত্রে আর ভাস্কর্যে কিভাবে প্রাণ সঞ্চার হয়। তিনি যথেষ্ট ধৈর্য সহকারে তার ছাত্রদের শেখান সাদা ক্যানভাসের প্রেম,মার্বেল পাথরের আশ্লেষ। মুশকিল হোলো, এই বাঙ্ময়তা জিনিসটা অনুভূতি ছাড়া বোঝানো বড় মুশকিল। হয়তো একজন ছাত্র ভাস্কর্য প্রণালীর আদ্যোপান্ত পড়ে একেবারে নিখুঁত একটি নারীদেহ গড়ে তুললো। কিন্ত তার অনুভূতিতে যদি ঘাটতি থেকে থাকে, তবে হাজার বই পড়ে আর বাটালি চালিয়েও সে অক্ষয় সৌন্দর্যের প্রসাদলাভ গ্রহণ করতে পারবেনা। তাই ভেরোচিও মাস্টার ছাত্র নেওয়ার ব্যাপারে বড় খুঁতখুঁতে। স্টুডিয়োর সামনে পা মোছার ন্যাকড়াতে সেই শিক্ষার্থীই পা দেবে, যার মধ্যে ওই ক্ষমতাটি আছে। নয়তো - কেটে পড়ো। শহরে আরো একশোটা ইস্কুল পাবে। এতে মাস্টারের কদর বেড়েছে। শিল্পকলার সমঝদারেরা তাঁকে সম্মান করে " সত্যদৃষ্টি" বলে ডাকে। সেটা শুধু তার সৃষ্ট ছবি বা মূর্তির জন্য নয়, ওই বাছাই করা ছাত্রগোষ্ঠীর জন্যেও বটে। তবে মুশকিল হলো এই যে সম্মানের সাথে আনুপাতিক হারে রেস্ত বাড়েনি। সেই নিয়ে মাস্টার নিজে খুব একটা ভাবিত নন। । মোটামুটি কাজ চালানোর মতো খানাপিনা আর ভদ্রগোছের পাড়ায় একটি থাকার ঠাঁই - এ ছাড়া আর দরকারই বা কি আছে। তিনি অকৃতদার। কম বয়েসে প্রেম পীরিত দু একটি জমলেও ব্যাপারটা ছাদনাতলা অব্দি যায়নি। এখন চুলে পাক ধরেছে। কাজ নিয়েই ব্যস্ত। নারীশরীরের আলেখ্য তাই বেঁধে রেখেছেন চিত্রে আর ভাস্কর্যে। মনের ওপর আর ছাপ ফেলতে দেন নি।
আপাতদৃষ্টিতে দেখলে এ জাতীয় " নিজের চরকায় তেল দেওয়া" গোছের কর্মিষ্ঠ ব্যক্তি অজাতশত্রুই হয়ে থাকেন। কিন্ত "সত্যদৃষ্টি " মশাই মানুষের ঐহিক ধুলো ধোঁয়ার দিকে খুব একটা দৃষ্টি দিতে শেখেন নি। তাই জানতেও পারেন নি,তার অজান্তেই শহরের অভিজাত মহলে একটা বিপরীত স্রোত তারই বিরুদ্ধে ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সেই স্রোত বেশ কিছুদিন ধরে ফল্গুধারায় বয়ে এসে এইবারে ধাক্কা দিয়েছে তার স্কুলের দরজায়।
- সার,সাজানো গোছানো মোটামুটি হয়ে গেছে।
একজন ছাত্র এসে খবর দিলো।
ভেরোচিও অন্যমনা হয়ে একটা পুরনো তৈলচিত্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মাদোনার ছবি। তারই আঁকা। অনেক অনেক দিন আগে। তখন সদ্য এই শহরে এসেছেন। শিক্ষানবিশি শেষে এই তার তৈলচিত্রে যথার্থ হাতেখড়ি। সে আজ তিন দশক আগেকার কথা। প্রাণে ধরে আর বিক্রি করতে পারেন নি।
অনেকদিন কেটে গেলো ক্যানভাসে আঁচড় টানতে টানতে। আর ভালো লাগে না...।
- ছবিটার কি খবর হে?
খবর দিতে আসা ছাত্রটি ইতস্তত করতে লাগলো।
ভেরোচিও ঈঙ্গিত বুঝলেন এবং যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে উঠলেন। আজকের যাবতীয় আয়োজন সব ওই বস্তুটির জন্যই। হিসেব মতো অন্তত দশদিন আগে শেষ তুলির টান পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্ত ঠিক এই মুহূর্তেও, যখন নতুন নগরপাল যেকোন সময়ে স্কুলে ঢুকতে পারেন - ছবিটা অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
- তোমাদের একটা আক্কেল নেই? সেই কবে থেকে শুনে যাচ্ছি " এই হয়ে এলো,এই হয়ে এলো " অথচ শেষ আর কিছুতেই হচ্ছেনা। বলি আমাকেই কি আবার হাত লাগাতে হবে?
লোরেঞ্জো দোনামোনা ভাব করে বললো : সার আমার কাজ তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত,,,,।
- বুঝেছি।
ভেরোচিও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দোষের মধ্যে তিনি যীশুখ্রীষ্টের একটি ছবিতে হাত দিয়েছিলেন। স্বেচ্ছায় নয়। কিছুটা দায়ে পড়ে। যে বিরুদ্ধ স্রোত আজ তাকে ঘিরে অদৃশ্য ভাবে পাকিয়ে উঠছে - ওই ছবি হোতো তার জবাব। ছবির মূল আলিম্পন আগেই হয়ে গেছে। বাকী রয়েছে দুটি দেবদূত আঁকা আর পেছন দিককার আকাশ ইত্যাদি। সেই দুটি দেবদূতের একটি নিয়ে কাজ করছে ভেরোচিওর আরেক ছাত্র - গত দু মাস ধরে। সেই কাজ আর শেষ হচ্ছেনা।
দরজার ঘন্টি বেজে উঠলো। ভারী জুতোর মশমশ আওয়াজ। তারপর ভেরোচিওর পার্সোনাল ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মারলো একটি প্রকাণ্ড হাসিখুশি মুখ।
- এসো জিওভানি।
ভেরোচিও ভেতর থেকে একটা ভালো ওয়াইনের বোতল বের করলেন।
- উফহ,,,আজকে বড্ড গরম।
ভেরোচিও কিছু বললেন না। এক পাত্র ওয়াইন এগিয়ে দিলেন শুধু।
জিওভানি জামার হাতা দিয়ে মুখের ঘাম ভালো করে মুছে বললেন - তুমি খাবেনা?
- নাহ।
- আরে এত চিন্তিত হয়ে পড়লে চলে। তোমার একটা সুনাম আছে তো।সেটা তো অর্জন করতে হয়েছে। আমি যদ্দুর খবর পেয়েছি...
- কি খবর পেয়েছো?
- নতুন নগরপাল গুনের কদর দিতে জানেন। তাঁর নিজের খুব একটা আসার ইচ্ছেও ছিলোনা। কিন্ত লুইগি পরিবার যেভাবে তোমার পেছনে লেগেছে সে তো জানোই। নগরপালের নতুন আপিস, লুইগিদের সমঝে চলতে হবে এখন। তাই দুদিক রক্ষা করে চলতে হচ্ছে।
ভেরোচিও চেয়ার থেকে উঠে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে ফ্লোরেন্সের ব্যস্ত সান লোরেঞ্জোর বাজার হাট। নানারকম সওদা করতে এসেছে লোকে। গ্রামদেশ থেকে চাষীরা এসেছে
ফলের ঝুড়ি নিয়ে। তাদের সামনে বসে স্টাডি করছে ভেরোচিওরই দুজন ছাত্র। একটা বুড়োকে মডেল হিসেবে নিয়ে আসছে লোরেঞ্জো। এই ছাত্রটি সত্যিই বেশ চটপটে। তাকে দেওয়া কাজ তো করেই নিয়েছে, এখন নতুন একটা ছবি নিয়ে বসবে।
- লুইগির ছোট ছেলেটা এখন দে লুকার আঁকার ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে,শুনেছ?
জিওভানি ওয়াইনে একটা লম্বা চুমুক মেরে বললো।
- ওর মাথা থেকে শিল্পী হবার ভুত নামেনি এখনো?
- নামে তো নিই, বরং আরো জেদ চেপে গ্যাছে।
- বাহ। বাহ।
- মাঝখান থেকে তুমি ফেঁসে গেলে।
- যে ছেলে একটা লাইন সোজা করে টানতে পারে না,তাকে আমি আঁকা শেখাবো জিওভানি?
ভেরোচিও সাধারণত গলা চড়াতে পছন্দ করেন না। কিন্ত সব সময়ে কি আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন রাখা যায়?
জিওভানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো।
- লুইগিরা মস্তান পোষে। শুধু তোমার নামে কান ভাঙানো করলে তো ঠিক আছে । এবারে রাস্তাঘাটে যদি অন্য ঝুটঝামেলা হয়, সেটা কিন্ত আমি সামলাতে পারবোনা।
ভেরোচিও আবার চেয়ারে এসে বসলেন। তাকালেন জিওভানির দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কমনীয় হাতের মধ্যে জিওভানির পুরুষ্টু আঙুল গুলো টেনে নিয়ে বললেন -
আমি খুবই দু:খিত। এইভাবে চ্যাঁচানোটা একদম ঠিক হয়নি। তুমি আমার জন্য যথেষ্ট করছো। তোমার কেরামতি না থাকলে এদ্দিনে এই স্কুল আমাকে গুটোতে হতো। তবে একজন পুরনো বন্ধু হিসেবে আমাকে যেটুকু চেনো,তাতে এটা কি তোমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগছে যে আমার কাছে এই স্কুলের সুনামের থেকে বড় আর কিছু নেই? নয়তো এত খেটেখুটে একটা ছবি তৈরি করার কি দরকার ছিলো? সেটা কি নগরপালকে ঘুষ দেওয়ার জন্য? না আমার আর আমার ছাত্রদের কাজ ওনাকে দেখানোর জন্য যে এই স্কুল যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে আদতে ফ্লোরেন্সের ক্ষতি। আমি তো বুড়ো হতে চল্লাম, কিন্ত নতুনদের তৈরি না করে গেলে চলবে কেন।
জিওভানি হেসে উঠলো সশব্দে।
- আরে তুমি কি ভাবছো আমি তোমার চিন্তা বুঝতে পারছিনা। তবে এটাও ঠিক, যে ছাত্র তৈরি করার চক্করে তুমি নিজের কাজের দিকে মোটেও নজর দিচ্ছোনা। ইতিহাস তোমায় ভুলে যাবে।
ভেরোচিও দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে বোঝালেন তাতে ওনার খুব একটা কিছু যায় আসেনা।
ঠিক এই সময়ে রাস্তায় শোনা গেলো সিপাইদের হাঁকডাক। ঘোড়ার টগবগ। পথচলতি উটকো মানুষের ক্যালরব্যালর।
জিওভানি জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বলল - হুম। নগরপালের দেহরক্ষীরা হাজির হয়েছে দেখছি।
ফ্লোরেন্স এখন গোটা ইউরোপখন্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। বিলাসে বৈভবে এর জুড়ি মেলা ভার। সেরা সেরা সব ব্যাঙ্কের মূল দফতর এখানেই। সোনাদানার বিশাল বাজার। মশলাপাতির বিরাট সব গুদোম। অন্যদিকে শিল্পকলাতেও সে অনন্য। এমন একটি শহরের নগরপাল আসার আগে তার দেহরক্ষীর দল যে সবাইকে সন্ত্রস্ত করে তুলবে,এ তো জানা কথা। ভেরোচিওর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া হোলো অন্যরকম।
- সর্বনাশ। ছবিটা তো এখনো শেষ হয়নি!!!!
জিওভানি মন দিয়ে দেহরক্ষীদের হাঁকডাক দেখছিলেন জানালা দিয়ে। কথাটা শুনেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে দাঁড়ালেন।
- কি???? যে ছবি উপহার দেবে সেটা,এখনো শেষই হয়নি?
ভেরোচিও আর কোন কথা না বলে দ্রুত তার ঘর থেকে বেরিয়ে স্টুডিওর পেছন দিকে যেতে লাগলেন। আজ একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। যদি এর মধ্যে তুলির রঙ শুকোয় তো ভালো। নয়তো ওই ছাত্রটিকে আর নিজের স্কুলে রাখবেন না। অনেক হয়েছে। প্রথমদিনেই তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত ছিলো। একেবারেই ছিলো। যদি না,,,,
আজ থেকে তিন বছর আগে হেমন্তের এক বিষন্ন সন্ধ্যা। ভেরোচিও তখন একটা পরীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তার কাজ মন দিয়ে দেখছিলো লোরঞ্জো, পেদ্রো, দে রোসি - তার বরিষ্ঠ ছাত্ররা। কেউই প্রথমে খেয়াল করেনি যে ভেরোচিওর স্টুডিওর দরজা অল্প ফাঁক করে একটি কৌতুহলী মুখ একবার উঁকি মেরেই গুটিগুটি পায়ে তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভেরোচিওর এক প্রাক্তন ছাত্র একটু আগেই দেখা করতে এসেছিলো। সে বেরিয়ে যাবার পর দরজাটা আর বন্ধ হয়নি।সকলের মনোযোগ আকৃষ্ট হলো যখন খটখটে হিলওয়ালা জুতোর সাথে দরজায় কেতাদুরস্ত করাঘাত বেজে উঠলো।
ঘাড় ফিরিয়ে ছেলেটাকে দেখেই ভেরোচিও চমকে উঠলেন। এত উজ্জ্বল চোখ তিনি এর আগে দেখেননি। তার সাথে মাথা ভর্তি পাটকিলে কোঁকড়া চুল আর নিখুঁত ডিমের মতো আকারের মুখশ্রী। চেহারায় অবশ্য অপুষ্টির ছাপ। দরজায় আবার করাঘাতে ভেরোচিওর সম্বিৎ ফেরে।
- আসুন।
দরজা ঠেলে একজন সা জোয়ান লোক প্রবেশ করলেন। বেশভূষা দেখে বোঝাই গেলো তিনি বেশ একজন হোমড়াচোমড়া কেউ হবেন। ভ্রূযুগল আর ঠোঁট - দুটোই বিশ্রী ভাবে কুঁচকে আছে।
- হ্যাঁ, বলুন কি দরকার?
- আপনার নামই ভেরোচিও?
ভদ্রলোক উদ্ধতভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
- হ্যাঁ। সেনর ভেরোচিও। আপনি?
- আমার নাম আন্তোনিও। পিয়েরো আন্তোনিও।
একটি টুলে কষ্ট করে বসে মাথার টুপিটা খুললেন ভদ্রলোক। তারপর স্টুডিওর চারিদিকে একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললেন - শিল্পকলা জিনিসটা কোনকালেই তেমন বুঝিনি। কি যে আনন্দ পায় লোকে এসব করে...।
- আপনার সেটা বোঝার খুব একটা দরকার আছে বলে মনে করিনা। আগমনের কারনটা এবার জানতে পারলে খুব ভালো হয়।
ভদ্রলোক এই রুক্ষতা বোধহয় আশা করেননি।শিল্পীরা সাধারণত মৃদুভাষী বলেই ধারনা ছিলো তার। দু তিন মূহুর্ত ভেরোচিওর দিকে খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রোগা ছেলেটার দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন -
এই ছেলেটাকে আপনার স্কুলে ভর্তি করতে হবে। আমাদের পল্লীতে আপনার স্কুলের খুব নামডাক শুনেছি আমি।
- আমার সৌভাগ্য যে আপনি আমার স্কুলের নাম শুনেছেন। কিন্তু এইভাবে কোন ছাত্র আমি ভর্তি করিনা।
আন্তোনিও আবারও অবাক হয়ে গেলেন। তার চেহারায় যথেষ্ট জাঁকজমক আছে। তিনি যে পয়সাওয়ালা সেটা ওপর থেকে বলে দিতে হয়না। এই অবস্থায় যে কোন আঁকার মাস্টার তো এই প্রস্তাব লুফে নেবেন!! বড়লোক ছাত্র কে না চায়?
- কিভাবে ভর্তি করাবেন তাহলে?
ভেরোচিও কথা না বাড়িয়ে ছেলেটাকে সামনে নিয়ে এলেন।
- কি নাম তোমার?
ছেলেটি চোখ নামিয়ে নিলো।
- ওই, নিজের নাম বল!! শালা মেয়েমানুষ নাকি.।
আন্তোনিও চেঁচিয়ে উঠলেন আচমকা।
ভেরোচিও বললেন - নিজের ছেলেকে এইভাবে ধমক দেওয়াটা কি খুব ঠিক হচ্ছে সেনর?
তিনি খেয়াল করলেন ছেলেটার চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে।
আন্তোনিও জিভ উল্টিয়ে বললেন - আরে ছাড়ুন তো মশাই। নিজের ছেলে! ফু:। আরে জোয়ান বয়েসে একটা ঝি মাগির সাথে ফষ্টিনষ্টি করেছিলাম। হতভাগী পেট খসালেই পারতো। তা না করে এই ব্যাটাকে জন্ম দিয়েছে। এখন গ্রামশুদ্ধ লোককে বলে বেড়াচ্ছে আমি যদি এই ছেলের ভার না নিই,তাহলে নাকি সে আইন আদালত করবে। কি জ্বালা। তাই ওকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি। এ ব্যাটার আবার ছোটবেলা থেকেই হিজিবিজি আঁকার শখ। আরো অদ্ভুত সব কান্ড করে। সেদিন দেখি একটা বোলতার চাকের ঠিক নীচে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে বোলতার ওড়াউড়ি দেখছে। একেকদিন গায়েব হয়ে যায়। আমাদের রাখাল ছেলেটা দেখেছে ব্যাটা আপন মনে পাহাড়ী সুঁড়িপথে ঘুরে বেড়ায়।
ভেরোচিও অধৈর্যভাবে বললেন - তা এসবের মধ্যে আমি কোথায় ঢুকছি।
- দেখুন মশাই।আমি একশোটা কাজে ব্যস্ত থাকি। এ ছেলের দেখভাল করার লোক বাড়িতে কেউ নেই। ওদিকে ঝি মাগীটাও নজরে রেখেছে আমি এই হতভাগাকে কি ভাবে রাখছি তার ওপর। তাই শহরে নিয়ে এলাম। ব্যাটা কাজ শিখুক আপনার কাছে। দুনিয়াদারির কিস্যু ওকে দিয়ে হবেনা। যদি আঁকাজোকা করে পেট চালাতে পারে।
- একে রাখবেন কোথায়?
- একটা চেনাজানা লোকের বাড়িতে বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। খোরাকি বাবদ আগাম টাকা দেওয়া আছে। আপনাকেও আগাম মাইনে দিয়ে..
ভেরোচিও হাত তুলে ভদ্রলোককে থামালেন।
- আমি কিন্ত ওকে আমার স্কুলে ভর্তি করতে এখনো রাজি হইনি সেনর।
আন্তোনিও এবারে টুল ছেড়ে ধাঁ করে উঠে দাঁড়ালেন।
- ধ্যার মশাই। তখন থেকে হেঁয়ালি করছেন কেন। একে ভর্তি করবেন কি না বলুন,নয়তো অন্য স্কুলে যাই।
ভেরোচিওর ছাত্র পেদ্রো একটু রগচটা গোছের। সে দুম করে আন্তোনিওর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বললো - আপনার স্পর্ধা তো কম নয়!! ফ্লোরেন্সের একজন সম্মানীয় শিল্পশিক্ষককে অপমান করছেন এভাবে। এক্ষুনি ক্ষমা চান!!
- আন্তোনিও পালটা চোখ গরম করে বললো - চাইয়ে দেখা!!!
হাতাহাতির সম্ভাবনা হওয়ার আগেই অবশ্য একটা চিকণ গলার আওয়াজে সবাই থমকে গেলো।
- এই মেয়েটার বাঁ হাত ছোট।
ছেলেটা ভেরোচিওর একটি তৈলচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর আঙুল দিয়ে সেটার দিকে দেখাচ্ছে। ছবিটা একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় অল্পবয়েসী মেয়ের। ফ্লোরেন্স শহরের নামজাদা এক ব্যবসায়ীর কনিষ্ঠা। মাসছয়েক আগে এর ছবি আঁকার বরাত পেয়েছিলেন ভেরোচিও। সেটি সম্প্রতি শেষ হয়েছে।
- কি হয়েছে ছবিটায়?
ভেরোচিও এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন।
- এই মেয়েটার বাঁ হাতটা ছোট আঁকা হয়েছে।
ছেলেটা ভেরোচিওর দিকে তাকিয়ে বললো। দৃষ্টিতে আশ্চর্য স্বচ্ছতা।
লোরেঞ্জো হি হি করে হেসে উঠলো। সে ভেরোচিওর প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে একজন বটে, কিন্ত ওর বয়েস বেশ কম। কৈশোরের চাপল্য তাই স্বাভাবিক।
- লোরেঞ্জো!!!
পেদ্রো ধমকে উঠলো।
- এত হাসির কি আছে?
- দু:খিত সার।
লোরেঞ্জো মাথা নীচু করলো।
সত্যি কথা বলতে গেলে কি ভেরোচিওর মতো উল্লেখযোগ্য শিল্পীর কাজের সমালোচনা করছে এক চোদ্দ বছর বয়সী বালক, এ দৃশ্য সত্যিই হাস্যোদ্রেক করে।
ছেলেটার অবশ্য খুব একটা তাপ উত্তাপ নেই। সে ভেরোচিওর দিকে তাকিয়ে আছে। যেন উত্তরের অপেক্ষা করছে।
ভেরোচিও কোন উত্তর না দিয়ে আন্তোনিওর দিকে তাকিয়ে বললেন- আপনার ছেলেকে আমার স্কুলে নিয়ে নিলাম। টাকা পয়সার ব্যাপারে কথা বলবো আমার অফিসে। ওই যে সোজা গিয়ে বাঁ দিকের দরজা। আপনি এগোন। আমি আসছি।
কথা কয়টি বলে ছাত্রদের দিকে উদ্দেশ্য করে বললেন - তোমরা ছেলেটাকে একটা খালি ক্যানভাস আর রঙ তুলি দাও। আমরা কথাবার্তা বলছি
তার মধ্যে ও যা ইচ্ছে আঁকুক।
ছাত্রবৃন্দরা কেউই বুঝলো না এই ছেলেটি পরীক্ষা পাশ করলো কিভাবে?
- সার, যদি অনুমতি দেন তো জিজ্ঞেস করি...
- পরে বলবো।
ভেরোচিও স্মিত হেসে অফিসের দিকে এগোতে লাগলেন। আন্তোনিও এসব সুক্ষ ব্যাপারের মধ্যে ছিলেন না। তিনি সবুজ সংকেত পেতেই অফিসের দিকে এগোতে লাগলেন।
দে রোসি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটাকে দেখছিলো। হঠাত ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো - তুই ছবির মেয়েটাকে চিনিস?
ছেলেটা লোরেঞ্জোর এনে দেওয়া সাদা ক্যানভাসের দিকে মন দিয়ে তাকিয়ে ছিলো। দে রোসির দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বললো
- না।
- সত্যি বলছিস?
- আমি তো এই প্রথমবার ফ্লোরেন্সে এলাম।
দে রোসি মাথা নাড়াতে লাগলো।
- আমার খেয়াল করা উচিত ছিলো। সারের প্রতিটা কাজ এত মনোযোগ দিয়ে দেখি....
- কি ব্যাপার দে রোসি? তুমি আবার ভেঙে পড়লে কেন।
পেদ্রো এগিয়ে এলো।
দে রোসি মুচকি হেসে বললো - নাহ,ভেঙে পড়িনি। তবে খটকা লাগছে। যদি এটা মেনেও নি যে হাতটা ছোট, সেটা সার বানাবেন কেন?
- কারন সেনর দে মান্তোভা সেভাবেই চেয়েছিলেন।
ছাত্রেরা কেউ খেয়ালই করেনি তাদের পেছনে ভেরোচিও কখন এসে দাঁড়িয়েছেন। আন্তোনিওর সাথে টাকাপয়সা এবং সইসাবুদের জন্য খুব একটা সময় লাগেনি বোঝাই গেলো।
- কিন্ত সেনর দে মান্তোভা..." পেদ্রো কিছুই বুঝতে পারছিলোনা।
- কেন এরম চেয়েছিলেন? উত্তরটা খুব সহজ। উনি ছবিতে কোন রকম খুঁত রাখতে চান নি। তার মেয়ের শারীরিক খুঁত থাকলেও সেটা যেন সেভাবেই রাখা হয় - এই ছিলো তার বক্তব্য।
- মানে....পেদ্রো মাথা চুলকোলো খচখচ করে।
- মানে হোল এই যে সেনোরিটা আনার বাঁ হাতটা সামান্য ছোট। আমি সামনাসামনি দেখেছি।
দে রোসি বললো।
- ঠিক। ছোটবেলায় রোগের প্রকোপে এমন হয়েছে। আমি সেনর দে মান্তোভা কে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই ব্যাপারটা ছবিতে রাখতে চান কি না। উনি রাজী হয়েছিলেন।
কথা শেষ করে ছেলেটার দিকে তাকালেন ভেরোচিও। সে তখন তার বাপের কাছ থেকে বিদায় নিতে ব্যস্ত।
- এবারে বুঝলে আমি ছেলেটাকে নিতে কেন রাজী হলাম?
পেদ্রো আর দে রোসি মাথা নাড়লো।
- আমার চোখ যে জিনিস এড়াতে পেরেছে,সেটা ও ধরতে পারলো কি করে ভেবে আশ্চর্য হচ্ছি।
দে রোসি বলেছিলো।
আশ্চর্য হওয়ার সেই শুরু। ছেলেটা তারপর নানারকম কান্ড ঘটিয়েছে। যেমন উলটো করে লেখা। আয়নায় ফেললে সে লেখা সোজা হয়ে যায়। যেমন কশাইয়ের দোকান থেকে হাড়গোড় নিয়ে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা সেগুলো নিয়ে নাড়াঘাঁটা। ছবি আঁকার দিকে তেমন নজর নেই। মাঝে মাঝে ভেরোচিও ঘাড় ধরিয়ে স্টাডি করতে পাঠান। সারাদিন ঘুরে হয়তো সে আধ পাতা স্কেচ করে আনলো। তবে এটাও ঠিক - যেটুকু আঁকে একেবারে নিখুঁত করে। ছবি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। ছেলেটার খুঁতখুঁতানিতে ভেরোচিও প্রশ্রয়ই দিয়েছেন। এমন কি শিক্ষানবিশির মাত্র দু বছরের মাথায় তিনি ছেলেটির হাতে তুলে দিয়েছেন তার ছবি শেষ করার ভার - লোরেঞ্জোর সাথে যৌথভাবে। কিন্ত এই ছেলেকে ভরসা করা বড় মুশকিল। হয়তো দেখা গেলো একটা গাউনের পাড় আঁকতেই সে কাটিয়ে দিলো পনেরো দিন। ছবি আঁকা ছাড়াও একশো রকম জিনিস নিয়ে সে মাথা ঘামায়। দে রোসি আর পেদ্রো ইতিমধ্যে স্কুল ছেড়েছে। পেদ্রো গেছে ওকালতি ব্যবসায়। দে রোসি গেছে মিলান - ওখানকার এক শিল্পের পৃষ্ঠপোষক তাকে সমাদর করে নিয়ে গেছে। নতুন ছাত্রও কয়েকজন এসেছে।
ভেরোচিওর সামনে বড় সঙ্কট এখন লুইগি পরিবারের সাথে তার বিরোধ। মাস তিনেক আগে তাদের বখে যাওয়া ছোট ছেলেটা এসেছিলো আঁকা শিখবে বলে। শিল্পকলায় আগ্রহ এখন ফ্লোরেন্স শহরের নতুন কেতা। সেই কেতায় গা ভাসিয়ে ছোটবাবু তো এলেন। কিন্ত দেখা গেলো তার হাতে তুলি আর ঘোড়ার পায়ে ভালো চামড়ার জুতো পরানো - দুইই এক। ভেরোচিও তাকে যথোচিত ভাবে বিদায় দিলেন। কিন্ত টাকার গর্বে লুইগিরা ধরে নিল এই প্রত্যাখ্যান মানে হোল অপমান। তারপর থেকে এ পরিবার ভেরোচিওর পেছনে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ - তিনি যথেষ্ট যত্ন সহকারে ছাত্রদের শেখাচ্ছেন না এবং আরো মারাত্মক অভিযোগটি হোলো যে তিনি নাকি ঈশ্বরে যথোচিত বিশ্বাস রাখেন না। প্রমাণ হিসেবে ভেরোচিওর চার্চে হাজিরার খতিয়ান দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সমাজে যদিও অনেকেই নিয়মিত চার্চে যাওয়া আস্তে আস্তে ছেড়ে দিচ্ছে, কিন্ত প্রকাশ্যে কেউ সে অভিযোগ আনলে তা গুরুত্ব সহকারেই দেখা হয়। লুইগিরা আরো কয়েকজন বংশবদ ফ্লোরেন্সবাসীর দরখাস্ত নিয়ে নগরপালের কাছে দাখিল করেছে এই মর্মে যে ছোট ছেলেদের এমন অবিশ্বাসী এবং উদ্ধত লোকের কাছে না পাঠানোই সমীচীন। এই " অভিযোগের " জবাবে ভেরোচিও একটি অনবদ্য তৈলচিত্র এঁকেছেন। যীশুখ্রীষ্টের ব্যাপ্টিজম নিয়ে। তাঁর ঈশ্বর বিশ্বাসের প্রমাণ। নতুন নগরপালকে এই ছবিটি দেওয়ার কথা। ছেলেটার ওপর দায়িত্ব ছিলো গোটা ছবির মধ্যে দুটি দেবদূতের একটি আঁকার। লোরেঞ্জো অন্যটির দায়িত্ব নিয়েছিলো যেটা সে আগেই শেষ করেছে। অন্যটি আর শেষ হয়না। ভেরোচিও কয়েকবার তাগাদা দিয়েছেন। সে ছেলের কোন হেলদোল নেই। এই করে করে আজ একেবারে শিয়রে সংক্রান্তি।
- লিও!!!
ছেলেটি ঘুরে তাকালো ভেরোচিওর দিকে।
স্টুডিওর পেছনদিকে একটা ছোট্ট ঘর আছে। সেখানেই ক্যানভাস টাঙিয়ে ছবিটি আকাঁ হচ্ছে। পাতলা কাঠের প্যানেলের ওপর অসামান্য একটি দৃশ্য। খ্রীষ্টের মাথায় জল ঢেলে দিচ্ছেন জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট। খ্রীষ্টের দৃষ্টি আনত, কড়জোড়ে তিনি গ্রহণ করছেন আশীর্বাদ। দুটি দেবদূত খ্রীষ্টের পায়ের কাছে বস্ত্রখন্ড নিয়ে বসে আছে। ছবিটি সমাপ্ত হয়েছে এইমাত্র।
লিও একটা কাপড় নিয়ে হাত থেকে রঙ মুছছিলো। সারের ডাকে উঠে দাঁড়ালো চকিতে।
উপস্থিত বাকি সকলে ভাবল একটা প্রচণ্ড ধমক অপেক্ষা করে আছে লিওর জন্য। ছবিটা যদিও শেষ হয়েছে, এই রঙ শুকোতে অন্তত তিনদিন রোদে দিতে হবে। নগরপালের হাতে আজ তুলে দেওয়া সম্ভব নয়।
কিন্ত এ কি!! ভেরোচিওর ভ্রুকুটিকুটিল দৃষ্টি এরকম বিস্ময়ে বদলে যাচ্ছে কেন? ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টির কানায় কানায় জল ভরে উঠছে কেন?
জিওভানি ভেরোচিওর কাঁধ ধরে বললেন - শরীর খারাপ করছে নাকি হে?
ভেরোচিও কোন উত্তর না দিয়ে আস্তে আস্তে ছবিটার সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন। তারপর মন দিয়ে দেখতে লাগলেন লিওর তৈরি দেবদূতটিকে।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন তার মুখ চোখ পোষাকের ভাঁজ। দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো চোখ দিয়ে।জামার হাতা দিয়ে সেটা মুছলেন। তারপর মাথা নামিয়ে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোরেঞ্জোকে বললেন
- লোরেঞ্জো, তিনটে জিনিস। আমার বড় তুলিটা রাখা আছে ডেস্কের ওপর। আমার চেয়ারের পেছনে দেখবে তোমার বাবার দেওয়া চামড়ার বাক্সটা আছে। এ দুটো,আর আমার মাদোনার ছবিটা - এখানে নিয়ে এসো তো।
- ব্যাপারটা কি হে?
জিওভানি শঙ্কিত।
- আয়,আমার কাছে আয়।
লিও কে সস্নেহে নিজের কাছে ডেকে নিলেন ভেরোচিও।
- ভালো মানুষ হোস বাবা। বড় শিল্পী হতে গেলে আগে বড় মানুষ হতে হয়। আর চোখ খোলা রাখিস। মন খোলা রাখিস।
লিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
- হ্যাঁ সার....
- " সত্যদৃষ্টি " মশাই, এই অধমকে দয়া করে বলবেন, আপনার এই মনোবিকার কেন?
জিওভানি অধৈর্য।
- মনোবিকার?
ভেরোচিও স্মিত হাসলেন।
- সত্যদৃষ্টি নামটা নিজের কানেই উপহাসের মতো লাগছে এখন। না হে,,,মনোবিকার না। একটা উপলব্ধি হচ্ছে।
- কি সেটা?
জবাব দেওয়ার আগেই লোরেঞ্জো এসে হাজির হোলো।
নিজের সবচেয়ে প্রিয় তুলিটা ভেরোচিও হাতে তুলে নিলেন। সেটার সারা গায়ে বুলিয়ে দিলেন স্নেহস্পর্শ। তারপর লিওর হাতটা টেনে গুঁজে দিলেন সেটা।
- আজ থেকে এটা তোর। সাবধানে রাখিস।
- আচ্ছা সার।
লিও তুলিটা নিয়ে নিজের পকেটে রাখলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো - আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন সার?
ভেরোচিও এক হাতে চামড়ার বাক্স, আরেক হাতে মাদোনার ছবিটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
- হ্যাঁ রে। অনেকদিন এক জায়গায় হোলো। এবারে অন্য কোথাও যাওয়া যাক।
জিওভানি লাফিয়ে উঠলেন - ক্কি??? এক্ষুনি নগরপাল এসে হাজির হবে... তুমি এসব কি নাটক শুরু করলে?
- নগরপালকে তুমি সামলিয়ে নিও। ছবি তো তৈরিই আছে। বলে দিও তিন চারদিন পরে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে।
- এই স্টুডিয়ো, টাকাপয়সা...।
- স্টুডিয়োর চাবী রাখা আছে আমার আলমারীর তিন নাম্বার তাকে। টাকাপয়সা এখানে বিশেষ কিছু নেই। তোমার হাতেই স্টুডিয়োর ভার তুলে দিলাম। চাইলে বিক্রি করতে পারো,চাইলে চালাতে পারো - যা ইচ্ছে।
লোরেঞ্জো আর লিও কাঁদোকাঁদো মুখে ভেরোচিওর সামনে এসে দাঁড়াল।
- সার, আমরা কি করেছি যে এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?
- তোরা কিচ্ছু করিস নি বাবা। এই শহরে অনেকদিন ধরেই আর মন টিঁকছে না। তার ওপর এইসব অত্যাচার। ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস অটল কিনা,সেটা নগরপাল বুঝবেন। এখানকার ধর্ম যাজকেরা বুঝবেন। আমার সত্যিই কোন দায় নেই।
- তবে এই ছবিটা আঁকার কি দরকার ছিলো?
জিওভানি খিঁচিয়ে উঠলেন। তাকে যে কত রকম হ্যাপা সামলাতে হবে সেটা ভাবতেই বুক ধড়ফড় করছে বেচারার।
- না,ছবিটা শুরু করার আগে পর্যন্ত ফ্লোরেন্স ত্যাগের বিশাল কিছু ইচ্ছে আমার ছিলো না। এই চামড়ার বাক্স অবশ্য আমি সব সময়েই তৈরি রেখে দি। তবে এখন....।
- এখন?
ভেরোচিও লিও আর লোরেঞ্জোকে ঈঙ্গিতে ঘরের বাইরে যেতে বললেন। তারা চোখ মুছতে মুছতে নিস্ক্রান্ত হলো।
দরজাটা ভালো করে ভেজিয়ে দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভেরোচিও বললেন - ছাত্র যখন শিক্ষককে অতিক্রম করে যায়, তখন শিক্ষকের কি করা উচিত জিওভানি?
জিওভানি দু হাত ছড়িয়ে বলল - মানে?? কে কাকে কোথায় অতিক্রম করে গেলো?
- ওই ছবিটা দেখে কিচ্ছু বুঝছো না?
জিওভানি ভালো করে ছবিটা দেখে বললো - কিছুই তো বুঝলাম না ভাইটি।
ভেরোচিও লিওর দেবদূতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললো - ছেলেটি যা এঁকেছে, সেই সৌন্দর্য আমার ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতায় যে ক্ষমতা সঞ্চয় করেছি তারও উপরে। এরপর থেকে যদি কোন ছাত্রকে আঁকা শেখাতে চাই তবে ওই দেবদূত আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে : কাকে ঠকাচ্ছেন সার?
- মানে একটা ষোলো বছরের ছেলে তোমার প্রতিভাকে ছাড়িয়ে গেলো? ভেরোচিও - লোকে তোমায় হাল্কা ছিটগ্রস্ত বলে। আমি এতদিন বিশ্বাস করতাম না। আজ দেখছি সত্যিই.."
ভেরোচিও ফিক করে হেসে উঠলো - কে কি ভাবে সে নিয়ে আমার তো কোনদিনই কিছু যায় আসেনি জিওভানি। তবে যদি আমার অনুমান মিথ্যে না হয়, আর যদি এই ছেলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে, তবে ওর নাম শিল্পী হিসেবে গোটা পৃথিবীতে একদিন ছড়িয়ে পড়বে। সেইদিন আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না। তবে সেই আনন্দটুকু নিয়ে কবরে যাবো যে আমার হাত দিয়ে এমন একটি বৈদূর্যমণির ঘষামাজা হয়েছিলো।
- তাহলে এবার তুমি কি করবে?
জিওভানির গলার আওয়াজে বোঝা গেলো সে হাল ছেড়ে দিয়েছে।
- ভয় পেয়োনা। নিরুদ্দেশে যাবোনা। মিলানে ঠাঁই গাড়ার ইচ্ছে আছে। পেদ্রো চিঠি লিখেছিল কয়েকদিন আগে। ওখানেও একটা স্কুল খুললে বেশ হয়। অনেক প্রতিভাশালী ছেলেপুলে আছে কিন্ত ভালো স্কুল নেই শুনলাম।
- কি শেখাবে?
- ভাস্কর্য। আমি এখনো অব্দি মূলত: ছবিই এঁকেছি। তবে আমার বিশ্বাস ভাস্কর্যেও নেহাত মন্দ করবো না।
- তাহলে চিত্রশিল্প..
- শেষ। সমাপ্তি।
জিওভানি মেঝের ওপরেই বসে পড়লেন।
- ওহ,হ্যাঁ। একটা ব্যাপার ভুলেই গেছি।
পকেট থেকে পাঁচটি স্বর্ণমূদ্রা বের করলেন ভেরোচিও।
- লিও কে দিয়ে দেবে। ওর শিক্ষার জন্য আগাম নিয়েছিলাম। বাকী ছাত্রদের পাওনা যা আছে সেই টাকা আমার আলমারীর ভেতরে রাখা টাকার গেঁজেতেই পাবে। লোরেঞ্জোর ব্যাপার তো জানোই। ওর বাবা গরীব চর্মশিল্পী।আমাকে টাকা তো দিতে পারেন নি তাই নানারকম উপহার দিয়ে থাকেন। " নিজের চামড়ার বাক্সটা উঁচু করে তুলে ভেরোচিও বললেন - এটাও ওনারই দেওয়া। দুর্দান্ত কাজ। ঈশ্বর শিল্পবোধ যে কোথায় কার মধ্যে দিয়ে দেন...।
জিওভানি যন্ত্রচালিতের মতো মুদ্রাগুলি নিলেন। ভেরোচিও লোরেঞ্জো আর লিওকে ভেতরে ডাকলেন অত:পর।
- ভালো থাকিস দুজনে। জিওভানির সাথে যোগাযোগ থাকবেই আমার। যদি শুনি শিল্পকলার থেকে তোদের একটুও নজর সরেছে..।
- তাহলে আপনি এক্কেবারে হারিয়ে যাবেন, তাই তো?
- ধুর পাগলা।
লিওর অশ্রুসিক্ত মুখটাকে নিজের বক্ষপটে টেনে নিয়ে এসে ভেরোচিও বললেন - কেউ কি আর পুরোপুরি পালাতে পাবে? তোদের মনের মধ্যে তো থাকবোই।
দুই কিশোরের কান্নায় ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠলো।
ভেরোচিও দীর্ঘশ্বাস ফেলে চামড়ার ব্যাগটা
তুলে নিলেন।
- শোন তোমরা। সামনের দরজা দিয়ে আমার যাওয়া চলবেনা। নগরপাল যে কোন মূহুর্তে হাজির হবেন। আমি পেছনের শৌচাগারের দরজা দিয়ে চলে যাচ্ছি। তোমরা থাকো। নগরপালকে বোল আমার কোন আত্মীয়ের খুব অসুখ তাই আপাতত কিছুদিন তুরিন প্রদেশে প্রস্থান করছি। গাঁয়ের নাম জিজ্ঞেস করলে বলে দিও যযে আমি কিছু বলে জানাইনি। তারপর দেখা যাবে।
- দেখা আর কি যাবে। এই ছেলেগুলোকে তো কেউ ধরবে না। আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে।
জিওভানি গজগজিয়ে উঠলেন।
- তা আধা পাগলের সাথে বন্ধুত্ব করলে এমন ঝামেলায় তো পড়তেই হবে।
ভেরোচিও হা হা করে হেসে উঠলেন। তারপর বন্ধুকে আলিঙ্গন করে, লিও আর লোরেঞ্জোর মাথার চুল আরেকবার এলোমেলো করে দিয়ে স্টুডিও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঠিক তার দু মিনিটের মাথায় উচ্চ শিঙাধ্বনি শুনে বোঝা গেলো নগরপাল দ্বারপ্রান্তে হাজির। বাকী ছাত্ররা সব বাইরের ঘরেই ছিল। হতভাগ্যেরা জানতেই পারলো না তাদের জীবনে কি পরিবর্তন ঘটে গেলো এইমাত্র।
শিঙাধ্বনি শোনামাত্রই জিওভানি " সব্বোনাশ " বলে দুদ্দাড়িয়ে মূল দরজার দিকে ছুটলেন। লোরেঞ্জো পা টানতে টানতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো তার সহ শিক্ষার্থীদের খারাপ খবরটা শোনাবার জন্য।
ছোট্ট এলোমেলো ঘরটায় মাস্টারের শেষ ছবির সামনে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো ষোল বছরের এক কিশোর। একা। তারপর টুলের উপর বসে পড়ে ভেরোচিওর তুলি বের করে রঙে চুবিয়ে নিলো সেটা। তার আঁকা এখনো শেষ হয়নি। এখনো শেষ তুলির টান দেওয়া বাকী। টাস্কানি প্রদেশের ভিঞ্চি গ্রামের সার পিয়েরো আন্তোনিওর জারজ সন্তানের ছবি এত সহজে শেষ হয়না।
এই জন্যেই তার তুলনা একমাত্র তিনিই। এই জন্যেই তার প্রতিটি শিল্পকর্ম আজও আমাদের হতবাক করে দেয়।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে নিয়ে এইজন্যেই আমাদের বিস্ময়ের আজও কোন শেষ নেই।।
No comments:
Post a Comment