শীতলপুর খুব দূরে নয়। আবার খুব কাছেও নয়। আমি অনেকদিন আগে ওখানে গেছি , তেমনটা বলা যায়না। আবার গতকালই ঘুরে এলাম বললেও ভুল হবে। ওই গ্রামটা আছে কোথাও,কখনো না কখনো ওখানে আমরা কেউ না কেউ নিশ্চই গেছি।
শীতলপুরে ছোট ছোট মাটির বাড়ি আছে। সেগুলোর উঠোন নিকোনো। সেখানে বৃষ্টির সময়ে ছাগল আর মুরগী আশ্রয় নেয়। শীতকালে তারা ওখানেই রোদ পোয়ায়। পোষা কুকুরটা দাওয়ার নীচে বসে চোখ বুজে ঝিমোয়। সন্ধেবেলায় উনুনের ধোঁয়া হাল্কা ভেসে থাকে। গ্রামের চৌমাথায় মুদির দোকানে বুড়োরা জমায়েত হয়। একটু দূরে বাঁশ ঝাড়ে ছেলে ছোকরার দল বাংলা নিয়ে বসে। এ অঞ্চলে মদ খাওয়া নিয়ে খুব একটা বাধ্য বাধকতা নেই। গ্রামে মোটরবাইক ঢোকে ভটভট করতে। চালের আড়তদার কিম্বা মুদি দোকানের সাপ্লায়ার। গ্রাম শেষ হবার মুখে একটা পুকুর রয়েছে,সেখানে বৌ ঝি রা কাপড় কাচে বাসন মাজে। গ্রামের চারিদিকে ছেঁড়া ছেঁড়া জঙ্গলে রাত নামে জোনাকীর ডানায় সওয়ার হয়ে। কুটুরে প্যাঁচার ডাক শোনা যায়।
গ্রাম থেকে বেরিয়ে, বাইকে করে পাঁচ মিনিটের রাস্তায় একটা ছোট্ট টিলা আছে। তার ওপরে উঠতে তোমার হাঁপ ধরবে না,যদি না চিপ্স খাওয়া বদন হয়। পাথুরে টিলা। এখানে ওখানে ঝোপঝাড় নয়তো স্রেফ ন্যাড়া পাথর সম্বল। গ্রামের বাচ্চাগুলোর কাছে এই টিলাটাই হোলো খেলার জায়গা। তারা এর মাথায় চড়ে, আবার অন্যদিকে গিয়ে নামে। টিলার ওপরে কারা এক গাদা ইঁট রেখে গেছিলো কখনো। সেগুলো ঢেলা হয়ে গেছে। টিলার মাথা থেকে তারা সেই ঢেলা ছোঁড়ে। অনেক অনেক দূর উঁচুনিচু ডাঙার দিকে তারা তাকিয়ে থাকে, হয়তো সেদিক থেকে ওদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলো। সূর্য ডুবুডুবু হলে ছেলেগুলো ঘরের পথ ধরে। তাদের মা রা শাঁখ বাজিয়ে ডাকে : ঘরে আয়ায়ায়ায়। এই টিলাটার কোন নাম নেই। হয়তো ছিলো কোনদিন, এখন সবাই ভুলে গেছে।
টিলাটার পায়ের নীচে একটা ডোবা আছে। সেখানে শালুক টালুক ফোটে। ব্যাঙ ডাকে বর্ষায়। ডাহুক চরে। ডোবাটা শীতকালে প্রায় শুকিয়ে যায়। তার নাবাল বুকে জন্মায় শীতালু ঘাস। সাপের খোলস পড়ে থাকে তার পাশে।
টিলাটার মাথায় তিনটে গাছ রয়েছে। বেঁটে বেঁটে বয়স্ক গাছ। ডেঁয়ো পিঁপড়ের দল এ গাছে ও গাছে চরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে পায়রা কিম্বা কাক শালিক এসে ডালের ওপর বসে। গাছগুলোর শিকড় এঁকেবেঁকে শিলার গর্ভে ঢুকে গেছে পোক্তভাবে। কোন ঝড় ওদের কিচ্ছু করতে পারবেনা। অবশ্য বাজ পড়লে আলাদা কথা। তিনটে গাছ তিনজন বন্ধুর মতো চুপ করে একে অন্যের সুখ দু:খ আর ডেঁয়ো পিঁপড়ে ভাগ করে নেয়।
এই টিলা,তার মাথায় গাছ, বাচ্চাগুলো আর শীতলপুর - এই সবকিছুর ছবি তুলেছিলাম। আজকে ফিরে দেখি সেগুলো সব সাদা হয়ে গেছে। শীতলপুর তাই আছে,আবার নেইও। সেখানে ফেরা যেতেও পারে,বা " ফিরবো" বলা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে এক লহমায়। একটা ভাঙা সাইকেল চড়ে আবার ওই টিলার নীচের ছোট্ট ডোবাটার ধারে বসে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে শোনা যেতে পারে গরুর গাড়ির টুংটাং, যখন সে ধান নিয়ে আল রাস্তা ধরে অনেক দূর চলে যায়। অথবা সবশুদ্ধ মিলে ভোজবাজির মতো হাপিসও হয়ে যেতে পারে।
আমাকে তাই শীতলপুরের ঠিকানা জিজ্ঞেস কোরো না।
স্বপ্নের আবার ঠিকানা হয় নাকি?
No comments:
Post a Comment