Monday, 12 March 2018

নাত্থুরামের ভেড়া


      *** নাত্থুরামের ভেড়া ****

নাত্থুরামের সাথে আমার আলাপ হয়েছিলো একটা অসমান প্রান্তরের ওপর। এই প্রান্তর চিরে গেছে রাস্তা। তার ওপর দিয়ে দিনে তিন বার বাস যায় শহরের দিকে। আমি শেষ বাস ধরবো বলে একদিন পাঁচটা নাগাদ দাঁড়িয়ে ছিলাম একটা চাল গুদামের পাশে। মিস করে গেলে আজ এ অঞ্চলেই বডি ফেলতে হবে। বাস লেট করছে। অসমান এই প্রান্তরের ওপর দিয়ে হু হু করে বয়ে যাচ্ছে জোলো হাওয়া। এখন বর্ষাকাল। আমার সামনেই মাইলের পর মাইল  উঁচু নীচু ডাঙা ঢাল বেয়ে ক্রমে দিগন্তে মিশেছে।  চাষআবাদ বিশেষ হয় না এই পাথুরে মাটিতে, তবে এ বছর বর্ষা ভালো হওয়াতে ফসল লাগানো হয়েছে। যে জমিতে ফসল নেই,সেখানে গরু ছাগল চরছে তাজা ঘাস খাওয়ার লোভে। পশুচারনের জন্য এ অঞ্চল বিখ্যাত। আর চরছে ভেড়া। সেই মেষপালের দিকে তাকিয়ে আছে নাত্থুরাম। ভেড়াগুলো নাত্থুরামের।

বেলার দিকে ঝেঁপে বৃষ্টি হয়ে আকাশে এখন এক কনাও ধুলো নেই। সেই জন্য দূরে নীল রঙের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে ওই পাহাড় বহু বহু দূর। রোজ দেখা যায়না তাই। আকাশে মেঘ রয়েছে । মাঝে মাঝে গুম গুম করে আওয়াজ ভেসে আসছে। " এ কি গভীর বাণী এলো ঘন মেঘের আড়াল থেকে। " রাতে আবার ঝরাতে পারে। বাস লেট করছে। আমি উসখুস করছি।

- কাঁহাতক জায়োগে বাবু?

আমার থেকে হাত বিশেক দূরে নাত্থুরাম  উবু হয়ে বসেছিলো। গায়ের রঙ পাকা ব্রোঞ্জ , পরনে খেটো ধুতি, হাতে বাঁশের লাঠি, মুখে বিড়ি, চোখের দৃষ্টি স্থির। পাকানো স্বাস্থ্য।

আমি গন্তব্য বললাম। নাত্থুরাম আমার দিকে না তাকিয়েই বললো - পয়েদল কিতনা টাইম লাগে গা?

ওকে বল্লাম যে আমি কখনো চেষ্টা করে দেখিনি পায়ে হেঁটে যাবার।

নাত্থুরাম ভেড়াগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো - ইয়ে সব লেকর হাম চলতে হ্যায়।

- কাঁহা?

- বস,চলতে হ্যাঁয়,,,,

নাত্থুরামের ভেড়াগুলো তখন ঘাস খাচ্ছিলো। বিকেলবেলার সূর্য, রশ্মি ফেলছিলো তাদের গায়ে। আমাদের কোলকাতায় দেখা গোলাপী দাগ মারা মাল নয় এগুলো। এদের লোমগুলো বেশ পশমী আর লম্বা লম্বা ল্যাজ। ভেড়াদের এমন লম্বা ল্যাজ আমি দেখিনি। ভেড়া, কিন্ত ভেড়া নয় টাইপের।

- এগুলো কি কুরবানীর ভেড়া?

নাত্থুরাম হাসলো।

- দুনিয়াদারীর কিছুই জানেন না দেখছি।

ভেড়ার সাথে দুনিয়াদারীর কি সম্বন্ধ বুঝলাম না।

নিজের কম্বলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বললো - ধরে দেখুন এটাকে।

আমি সন্তর্পনে হাতে নিলাম। ভেবেছিলাম বিচ্ছিরি কুটকুটে আর ঘেমো গন্ধওয়ালা পদার্থ হবে। কিন্ত দেখা গেলো মোটেই তা নয়!! দিব্যি তুলতুলে নরম। খানদানী জিনিস মনে হচ্ছে।

- এই কম্বল তৈরি হয়েছে ওদের গা থেকে।

নাত্থুরাম গর্বিত ভাবে বিড়ি ধরালো।

আমি বেশ সম্ভ্রম নিয়ে একবার ভেড়াগুলোর দিকে আর একবার নাত্থুরামের দিকে তাকালাম। নিজের ভেড়ার লোম থেকে তৈরি কম্বল পরে যে মানুষ তার থেকে ভাগ্যবান আর কে আছে।

- ভেড়ার পাল নিয়েই আমাদের জীবন বাবু। আমি,আর আমার দুটো ছেলে বেরিয়েছি শ্রাবণের প্রথম হপ্তায়। ভেড়া ঘাস খাচ্ছে।ভেড়ার পশম আরো মোলায়েম হচ্ছে। এই পশম বেচে আমাদের সংসার।

- সেই সংসারে কে থাকে?

আমি নাত্থুরামের পাশে একটা জেগে থাকা পাথরের ওপর বসলাম। বাস লেট করছে।

- আমার আওরৎ আছে। ছেলেদুটোর বিয়ে শাদী দিলাম। ওরাও বেরোবে ধান কাটাইয়ের সময়।

- তোমার ছেলেগুলো কই?

নাত্থুরাম অনির্দিষ্ট ভাবে দূরে প্রান্তরের দিকে আঙুল দেখায়।

- পালের সঙ্গে আছে কোথাও।

সন্ধে নামছে বর্ষাপীড়িত চরাচরের ওপর। ঝিঁঝিপোকার ডাক তীব্রতর হচ্ছে। ওরা বাড়ি ফিরবে না?

- আজকে এখানেই থেমেছি। তিনদিন ধরে হাঁটার পরে। এর আগে থেমেছিলাম রামগড়ের আগে। তার আগে হাজারিবাগ,তার আগে দুমকা...।

- তোমরা আসছো কোথা থেকে?

নাত্থুরাম নিরুত্তর থাকে।

- বড়জোড়া অব্দি যাবার আছে। ওখানে ইয়াব্বড় হাট বসে পশমী ভেড়ার।

আমি আকাশ পাতাল ভেবেও এরকম কোন হাটের কথা মনে করতে পারলাম না। শহুরে মানুষ। শোনপুরের মেলা জানি। পুষ্করের মেলা জানি। কিন্ত বড়জোড়ার ভেড়ার মেলা?

আমার ভ্রু কুঞ্চন দেখে নাত্থুরাম হাসে।

- ওসব শহুরে লোকদের জায়গা নয় বাবু।

গা শিরশির করে। কোন অজানা দেশের লোক এরা?

কম্বলটার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে নাত্থুরাম বললো - এসব আমরা নিজেদের জন্য করি বাবু। বিক্রির মাল নয়। আজকালকার মেয়েগুলো অবশ্য এসব তেমন করতে পারেনা। এটা আমার মায়ের তৈরি।

ওর চোখের দৃষ্টি আবিল হয়। কম্বলের ওমে মায়ের স্নেহ জেগে থাকে যাযাবরের কাছে।

- দুইদিন এখানে থাকবো। তারপর ফের হাঁটা। বেশীদিন কোথাও থাকিনা একভাবে। থানা পুলিশের ঝামেলা শুরু হয়। এখানে এলে তখন আর একটা ভেড়ার লোমও দেখতে পাবেন না। হ:।

- তোমরা রাত্তিরবেলা থাকো কোথায়?

- পালের কাছেই তো থাকতে হয়। রাত্তিরে হুড়ার আসে। তাই পাহারা দিতে হয়। ওই শুয়ে পড়ি...। তাঁবু থাকে সাথে।

দুজনে পাশাপাশি বসে আছি কিন্ত মনে হয় মাঝখানে দুস্তর ব্যবধান। এইসময়ে দূরে বাসের আলো দেখা যায়। আমি ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়ি। নাত্থুরাম ভেড়াগুলোকে " হ্যাট হ্যাট " করে যাতে কেউ বাসের সামনে চলে না আসে হঠাত। ভেড়াগুলো শান্তমনে ঘাস খেতে থাকে। সবুজ প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকে সফেদ পশম।

- আয়াচ্ছা।

আমি হাত দেখাই। নাত্থুরাম লাঠি উঁচু করে। ওই লাঠি দিয়েই ওরা হুড়ার তাড়ায়। খুঁটিতে বাঁধা মানুষ দেখলে তাদেরও হয়তো তাড়ায়।

বাসের আলোয় ভেড়ার পাল আর নাত্থুরাম ভেসে ওঠে একবার, ফের ঝাপসা হয়ে যায় অতীতের মতো। প্রান্তর পেছনে পড়ে থাকে। বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয় যায় সেদিন। রাতে আবার বৃষ্টি নামে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নাত্থুরামের কথা ভাবি। ভেড়ার পাল নিয়ে এই ঘোর বৃষ্টিতে সে হুড়ার তাড়াচ্ছে। তার কাঁধে মায়ের দেওয়া কম্বল।

ওর নাম নাত্থুরাম নয়। আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করিনি।

তারার আলোয় পথ চলা মানুষদের কি নাম জিজ্ঞেস করতে আছে?





No comments:

Post a Comment